দলত্যাগীদের নিয়ে বড় পদক্ষেপ! স্পিকারকে কড়া হুঁশিয়ারি অভিষেকের, না মানলে সোজা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার জল্পনা

দলত্যাগী সাংসদদের ভবিষ্যৎ এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বৈধতা নিয়ে লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আর অনির্দিষ্টকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে নারাজ সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। গত বুধবার খোদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সংসদ ভবনে সরাসরি সাক্ষাৎ করে দলের এই কঠোর মনোভাব ও অসন্তোষের কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে এসেছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, গত বেশ কিছুদিন ধরে একাধিক দলত্যাগী সাংসদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা কিংবা তাঁদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ এবং রহস্যজনক টানাপড়েন চলছে। যদি এই বিষয়ে লোকসভার স্পিকারের দপ্তর থেকে অতি দ্রুত কোনো চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়, তবে বাধ্য হয়েই দলের পক্ষ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার জোরালো হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জানা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল গত বুধবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়। ওই প্রতিনিধিদলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল এবং কীর্তি আজাদের মতো বিশিষ্টজনেরা। বৈঠক শেষ হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান যে, এর আগে গত ২২-২৩ জুলাইও তৃণমূলের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল একই ইস্যুতে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার পর দীর্ঘ প্রায় কুড়ি দিন অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও স্পিকারের দপ্তর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কথা জানানো হয়নি।
কালীঘাটস্থ তৃণমূল ভবনের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হচ্ছে যে, দলের একাধিক নির্বাচিত সাংসদ বর্তমানে নিজেদের অপর একটি রাজনৈতিক দল তথা এনসিপিআই-এর সাংসদ হিসেবে প্রকাশ্যে পরিচয় দিচ্ছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, লোকসভার অভ্যন্তরীণ সরকারি নথিতে এবং কার্যবিবরণীতে এখনও পর্যন্ত তাঁদের নামের পাশে পুরনো দল অর্থাৎ এআইটিসি (AITC)-ই লেখা রয়েছে। এই গুরুতর অসঙ্গতি এবং স্পিকারের বর্তমান ভূমিকা নিয়েই এখন জোরালো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অভিষেকের সোজা কথা, সংশ্লিষ্ট এই সাংসদরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সময় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক এবং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখকে সামনে রেখেই সাধারণ মানুষের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁরা সম্পূর্ণ সুবিধামতো নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় বদল করে অন্য দলের দাবি করছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের প্রকৃত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক কী, তা স্পষ্ট করে দেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব একমাত্র লোকসভার স্পিকারেরই।
বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। সংবিধানের দলত্যাগ বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) বিভিন্ন কঠোর বিধানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দলবদলকারী ওই নির্দিষ্ট সাংসদদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই প্রায় কুড়িরও বেশি পৃথক ডিসকোয়ালিফিকেশন পিটিশন বা অনাস্থা ও খারিজের আবেদন জমা পড়েছে। অভিষেকের প্রধান অভিযোগ, গত জুন মাসেই এই সমস্ত আবেদনপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের আইনি নিষ্পত্তি বা পদক্ষেপ করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান যে, দলত্যাগ সংক্রান্ত যেকোনো বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই স্পিকারকে আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদি সেই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে সংসদীয় ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হবে। বর্তমানে স্পিকারের সামনে মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট পথ খোলা রয়েছে—হয় সংশ্লিষ্ট দলত্যাগী সাংসদদের আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দলের স্বীকৃতি দেওয়া, অথবা দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এছাড়াও এদিনের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে লোকসভার অন্দরে তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থগিতাদেশ বা সাসপেনশনের বিষয়টিও বিশেষভাবে উত্থাপন করা হয়। অভিষেকের দাবি অনুযায়ী, এর আগে এই সাসপেনশনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখার আশ্বাস দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি। তবে স্পিকারের পক্ষ থেকে নাকি জানানো হয়েছে যে, আগামী অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তিনি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখবেন। এখন রাজনৈতিক মহলের সমস্ত নজর এই দিকেই রয়েছে যে, স্পিকারের দপ্তর থেকে আদৌ কোনো ইতিবাচক বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে কি না এবং শেষ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় কড়া নাড়তে যায় কি না।