তৃণমূলে মহা ভাঙন! একুশে জুলাইয়ে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে কুণাল-অরূপদের চরম কোন্দল!

রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে ঐতিহাসিক ক্ষমতার পালাবদলের পর এই প্রথমবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবস। দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও রাজনৈতিক কোন্দলের জেরে এ বছর কলকাতা শহরে একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে নয়, বরং খণ্ডবিখণ্ড হয়ে মোট তিনটি আলাদা জায়গায় পালিত হচ্ছে তৃণমূলের শহিদ দিবস। একদিকে মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির সামনে কর্মসূচি পালন করছে ঋতব্রত পন্থী তৃণমূল শিবির, অন্যদিকে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে ক্যাথিড্রাল রোডের খোলা চত্বরে বিশাল শহিদ সমাবেশের আয়োজন করেছে কালীঘাটপন্থী মূল তৃণমূল শিবির। এমনকি এর পাশাপাশি কংগ্রেস শিবিরও পৃথকভাবে নিজস্ব কর্মসূচি পালন করছে। কলকাতার বুকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত এই একাধিক সভার জেরে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কোন সভাটি দলের আসল বা দাপ্তরিক কর্মসূচি এবং কোনটিতে কর্মীরা যোগ দেবেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন অনেকে। এমতাবস্থায় দলের একাংশের বিরুদ্ধে কর্মীদের ভুল বুঝিয়ে অন্য সভায় টেনে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন কালীঘাট শিবিরের হেভিওয়েট নেতা কুণাল ঘোষ।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলে কুণাল ঘোষ সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলে দাবি করেছেন যে, ভিক্টোরিয়া হাউজ বা ক্যাথিড্রাল রোডের মূল সমাবেশে যোগ দিতে আসা অনেক কর্মী রাস্তা চিনতে না পেরে ভুলবশত অন্য দিকে চলে যাচ্ছেন। সেখানে উপস্থিত নেতারা নাকি কর্মীদের ভুল বুঝিয়ে দাবি করছেন যে ওখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসবেন। কুণাল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘ওখানে দিদির ছবি নেই, কর্মীরা তা জেনেই সেখান থেকে চলে আসছেন। এই গদ্দার ও বেইমানরা আসলে বিজেপির বি-টিম হিসেবে কাজ করছে। সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল কর্মীদের আসল আবেগ একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই রয়েছে। পুলিশকে ব্যবহার করে হুমকি দিয়ে এবং ভুল বুঝিয়ে লোক টানার ব্যর্থ চেষ্টা চলছে। আমরা খবর পাচ্ছি, লোকজন জোগাড় করতে না পেরে এখন নাকি বিজেপির থেকেও লোক ধার করার চেষ্টা চলছে। অনেকেই নিজেদের স্বার্থ বাঁচানোর খাতিরে বা ভয়ে ওদিকে ভিড় জমিয়েছেন, কিন্তু তৃণমূলের আসল কর্মীরা সব আমাদের দিকেই চলে আসছেন।’ কুণাল ঘোষের এই মন্তব্যের পরই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কুণাল ঘোষের এই বিস্ফোরক ও কড়া অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অপর হেভিওয়েট নেতা অরূপ বিশ্বাস। কুণালের দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়ে অরূপ বিশ্বাস পালটা কটাক্ষের সুরে বলেন, ‘যাদের সভায় জনসমাগম কম হয় বা পর্যাপ্ত লোক হয় না, স্বভাবতই তারা এই ধরনের অবাস্তব ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করতে শুরু করে। ভিড় না হলে সবাই এভাবেই অন্য শিবিরের ঘাড়ে দোষ চাপায়।’ আজকের এই দিনটির পবিত্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অরূপ আরও বলেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধার দিন, এটি আমাদের শহিদ তর্পণের দিন। আমি রাজ্যের সমস্ত প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী ও সমর্থকদের আহ্বান জানাচ্ছি, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দীর্ঘ সংগ্রাম করে দলকে ক্ষমতায় এনেছেন এবং গত ১৫ বছর ধরে সরকারের সুফল পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁরা যেন আমাদের এই প্রধান সমাবেশে এসে ভিড় জমান। আমাদের এই লড়াই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই—যারা একাই বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে দলকে শক্তিশালী করছে।’ সবমিলিয়ে, একুশের শহিদ দিবসের পবিত্র মঞ্চকে কেন্দ্র করে দুই শীর্ষ নেতার এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ এবং দ্বিমুখী রাজনৈতিক লড়াইয়ে দলের অন্দরের চরম বিশৃঙ্খলা ও ফাটল আবারও সর্বসমক্ষে চলে এসেছে।