তিস্তা-জলঢাকার জল বাড়লেই বিপদ! গতবারের ভুল শোধরাতে নয়া বাঁধে পলিথিন ঢাকা, সতর্কতায় রাত জাগছে জলপাইগুড়ি প্রশাসন

ঘূর্ণিঝড় ‘মন্থা’-র প্রভাবে উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ে ফের একবার বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ৪ অক্টোবরের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও টাটকা। সেই কারণে, “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়”—এই প্রবাদ মেনেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নেমে পড়েছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন নদী তীরবর্তী এলাকার প্রায় তিন হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে এনেছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের একাধিক জায়গায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জলপাইগুড়ি আঞ্চলিক আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ময়নাগুড়ি, দার্জিলিং, সেভক, বানারহাট, বক্সাদুয়ার এবং মূর্তিতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির ফলে বালাসন নদী এবং দুধিয়ার জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রশাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি এড়াতে বাঁধ মেরামতে জোর
গত ৪ অক্টোবরের রাতে ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে জলঢাকা নদীর মূল বাঁধ প্রায় ২৩০ মিটার ভেঙে যায়, যার ফলে ময়নাগুড়ি ও ধূপগুড়ি ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে উত্তর পূর্ব সেচ বিভাগের প্রাক্তন চিফ ইঞ্জিনিয়ার কৃষ্ণেন্দু ভৌমিককে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং বাঁধগুলো প্রায় ঠিক করে ফেলা হয়েছে।

কিন্তু এবারও সিকিম থেকে নেমে আসা তিস্তা এবং ভুটান থেকে নেমে আসা জলঢাকা নদীতে জল বাড়লে সমতলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই সেচ বিভাগের ইঞ্জিনিয়াররা দ্রুত গতিতে জলঢাকা নদীর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করছেন। বাঁধের নতুন মাটিকে ধ্বস থেকে বাঁচাতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

সেচ দফতরের ময়নাগুড়ির বিশেষ দায়িত্বে থাকা বাস্তুকার দেবাশিস মুস্তাফি বলেন, “উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। বাঁধের দু’পাশের বোল্ডার বাঁধানোর কাজ চলছে, যা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে।”

ত্রাণ শিবির ও প্রশাসনের সতর্কতা
বুধবার থেকে নদী তীরবর্তী এলাকায় নদীর জলস্তর বৃদ্ধিতে সচেতনতা আরও জোরদার করেছে প্রশাসন। জলপাইগুড়ির জেলাশাসক শামা পারভিন বলেন, “জেলার নদী তীরবর্তী ও বানভাসি এলাকার প্রায় তিন হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে তুলে এনেছি আমরা। মন্থার যে প্রভাব রয়েছে, তার জন্য সব ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তৈরি আছি।”

ময়নাগুড়ির বিডিও প্রসেনজিৎ কুণ্ডু জানান, চারেরবাড়ি নগেন্দ্রনাথ হাইস্কুল ও আমগুড়ি হাইস্কুলে বানভাসিদের জন্য ক্যাম্প করা হয়েছে। যদিও অনেকেই এখনো নিরাপদ স্থানে যেতে রাজি হননি। তবে ব্লক প্রশাসন সব রকমের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক রয়েছে।

এদিকে, জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সভাপতি মহুয়া গোপ জানিয়েছেন, “সিকিম ও ভুটানে বৃষ্টিপাত হলে আমাদের সতর্কতা রাখতেই হয়। ধূপগুড়ি ও ময়নাগুড়ির জলঢাকার ক্ষেত্রে মাইকিং করা হয়েছে। প্রতিটি মহকুমায় নৌকা ও স্পিড বোট তৈরি রাখা হয়েছে এবং এনডিআরএফ, এসডিআরএফ-সহ সিভিল ডিফেন্স কর্মীদের অ্যালার্ট করে রাখা হয়েছে।”

অন্যদিকে, পাহাড়ে বালাসন নদীর জলস্তর বেড়েছে এবং দুধিয়াতে অস্থায়ী সেতুর কাছ দিয়ে জল বইছে। ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে একটি ছোট ধস নামলেও, দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। দার্জিলিং জেলা প্রশাসনও পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy