তিব্বতে ভয়াবহ ভূমিধস নিয়ে মুখ খুললেই কড়া শাস্তি! চিনের ড্রাকনিক ইন্টারনেটে চরম সেন্সরশিপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে শোরগোল

তিব্বতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গিরং বন্দরে (Gyirong Port) ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিধস এবং তুষারধসের বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে অনলাইনে চলা স্বাধীন আলোচনা ও সমালোচনার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দমনপীড়ন শুরু করেছে চিনা কর্তৃপক্ষ। গত ২৬ আগস্ট সংঘটিত এই মর্মান্তিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং তাতে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট বা মন্তব্য করার অপরাধে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, চিনের বিতর্কিত ‘ক্লিন ইন্টারনেট ২০২৬’ (Clean Internet 2026) বিশেষ অভিযানের আওতায় মিথ্যে তথ্য ছড়ানো এবং জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগ এনে ইতিমধ্যেই অন্তত ১০ জন নাগরিককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এমনকি এই সর্বশেষ অভিযানের ঠিক আগেই অনুরূপ অনলাইন প্রতিক্রিয়ার জন্য আরও দু’জনের বিরুদ্ধে একই ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল প্রশাসন।

নাগরিকদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করার এই কড়া পদক্ষেপ চিনের সুপ্রতিষ্ঠিত ও কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। চিনের কড়া নীতি অনুযায়ী, দেশটিতে কার্যরত সমস্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলকভাবে বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং যেকোনোও সংবেদনশীল, বেআইনি বা সরকারের অস্বস্তির কারণ হতে পারে এমন কনটেন্ট অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হয়। চিনা প্রযুক্তি ব্যবস্থার শক্তিশালী স্বয়ংক্রিয় সেন্সরশিপ অ্যালগরিদম মুহূর্তের মধ্যে সংবেদনশীল শব্দ ও বিষয়বস্তু শনাক্ত করে ফেলে। এর জেরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়—যেমন জোর করে তাদের পোস্ট মুছে ফেলা, অ্যাকাউন্টে সাময়িক বা স্থায়ী বিধিনিষেধ আরোপ করা, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা কিংবা алгоритমের মারপ্যাচে তাদের পোস্টের রিচ বা দর্শক-শ্রোতার কাছে পৌঁছনোর সুযোগ চিরতরে কেড়ে নেওয়া। গোয়েন্দা সূত্রগুলির দাবি, গিরং ধস নিয়ে যারা সোশ্যালে সরব হয়েছিলেন, তাদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের সমস্ত মন্তব্য ও পোস্ট ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে। এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপের ফলে যেকোনো জরুরি বা সংকটের পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের নিখুঁত বিবরণ, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সংক্রান্ত দাবি এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনামূলক বক্তব্যের অবাধ প্রচার মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, চিনা কর্তৃপক্ষ তাদের এই দমনমূলক অভিযানকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং জনকল্যাণমূলক তত্ত্বে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। বেইজিংয়ের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, ‘ক্লিন ইন্টারনেট ২০২৬’ অভিযানের মূল লক্ষ্য কোনো বৈধ আলোচনা বা সমালোচনা দমন করা নয়, বরং ইন্টারনেটে ইচ্ছেমতো ছড়ানো গুজব এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংক্রান্ত মনগড়া তথ্যের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বেশ কয়েকজন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃতভাবে তিব্বত সীমান্তে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছেন এবং কোনো রকম অফিশিয়াল যাচাই ছাড়াই ব্রেকিং নিউজ ছড়াচ্ছেন। অথচ তথ্য বলছে, হিমবাহ ধসের জেরে তিব্বতের শিজাং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গিরং বন্দর এলাকায় এই ভয়াবহ ধস নামে, যা নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ এবং তীর্থযাত্রীদের অন্যতম প্রধান রুট। চিনা কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে এই বিপর্যয়ে মাত্র তিনজনের মৃত্যু এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ থাকার কথা স্বীকার করলেও, পরবর্তীতে ৩০ আগস্টের সরকারি পরিসংখ্যানে জানানো হয় যে গিরং কাউন্টিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিখোঁজদের তালিকায় ২৩টি দেশের মোট ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

হঠাৎ করে হতাহতের এই বিশাল ফারাক এবং সরকারি তথ্য প্রকাশের চরম সময়ানুবর্তিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। চিন বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা তথ্য যাচাইয়ের সাপেক্ষেই নিয়মিত পরিস্থিতির আপডেট প্রকাশ করছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সমালোচকদের জোরালো প্রশ্ন, অনলাইনে সমস্ত ধরনের স্বাধীন আলোচনা ও পোস্ট সীমিত বা ডিলিট করে দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষে এই বিপর্যয়ের প্রকৃত মাত্রা স্বাধীনভাবে যাচাই করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না। বিশেষ করে যখন গিরং বন্দরের দুর্গম ভূখণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে প্রশাসন, ঠিক তখনই তথ্য গোপনের এই প্রবণতা চিনের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে আবারও কাঠগড়ায় তুলেছে।