“তরুণদের কথা শুনুন, বলপ্রয়োগ করলেই বিপদ!” ছাত্র আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রকে চরম সতর্কবার্তা দিল শীর্ষ আদালত!

ছাত্র বিক্ষোভ এবং আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চরম সংযম প্রদর্শনের একগুচ্ছ মূল্যবান পরামর্শ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বুধবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিকালে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মৌখিক পর্যবেক্ষণ পেশ করে জানায় যে, সুস্থ গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ মিছিল বা প্রতিবাদের সময় প্রশাসনের সবসময় অত্যন্ত সতর্ক ও সংবেদনশীল মনোভাব নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া উচিত। আদালতের স্পষ্ট অভিমত, এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে উল্টে আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র বিরুদ্ধে চলা ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন আকস্মিক হিংসা ছড়ানোর অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলার শুনানির প্রসঙ্গের রেশ ধরেই শীর্ষ আদালত এই বিশেষ মন্তব্য করেছে। এই মামলার পাশাপাশি দিল্লি ও দেশের অন্যান্য রাজ্যে সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভ ঘিরে দায়ের হওয়া সমস্ত সমজাতীয় মামলা একসঙ্গে তালিকাভুক্ত করে একসঙ্গে শুনানি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিচারপতিদের এই বিশেষ বেঞ্চ। তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহানুভূতিশীল বার্তা দিয়ে প্রধান বিচারপতি শুনানিকালে উল্লেখ করেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যকর উপায় হলো আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়া মনোযোগ সহকারে শোনা। তাঁরা কেন বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছেন, তা খোলা মনে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। এরা সকলেই এ দেশের তরুণ-তরুণী, সঠিক সময়ে তাদের সঠিক পরামর্শ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে।” আদালতের দ্ব্যর্থহীন মত, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আগ্রাসী বা কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলতে পারে এবং নতুন করে হিংসার বিষাক্ত বীজ বপন করতে পারে।

একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট এও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ প্রশাসন কীভাবে মাঠে নেমে এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি সামাল দেবে, সেই বিষয়ে প্রথমাংশে তাদের দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের ওপরই আস্থা রাখা উচিত। এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রের সেন্ট্রাল গভমেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট বক্তব্যও গুরুত্ব সহকারে শুনে সামগ্রিক বিষয়টি বিচার বিবেচনা করে দেখবে দেশের শীর্ষ আদালত।

প্রসঙ্গগত, চলতি বছরের গত ২০ জুলাই নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর ইস্যুতে দেশজুড়ে আলোড়ন তুলে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির কঠোর ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর এবং তার আশপাশের সংবেদনশীল এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালীন আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষীদের খণ্ডযুদ্ধ ও তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে। দিল্লি পুলিশের প্রাথমিক দাবি অনুযায়ী, ওই ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় ৬৫ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী এবং ২০০-রও বেশি পুলিশকর্মী গুরুতর জখম হন। পরবর্তী সময়ে তীব্র অভিযোগ ওঠে যে, আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী প্লাস্টিক পেলেট বা বুলেট ব্যবহার করেছিল। এই সংক্রান্ত একটি গোপন অভ্যন্তরীণ তদন্তে অবশেষে প্রকাশ্যে আসে যে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF)-এর এক বিশেষ জওয়ান ওইদিন মোট সাত রাউন্ড পেলেট ফায়ার করেছিলেন, যার মধ্যে অন্তত পাঁচটি সরাসরি আন্দোলনকারীদের গায়ে এসে লাগে। সংবাদমাধ্যমের জোরালো প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, পেলেট আঘাতের জেরে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল।

তবে এই সমস্ত আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই অবসান ঘটেছে দীর্ঘ অচলাবস্থার। দীর্ঘ ৩৬ দিন ধরে লাগাতার চলা নিজেদের অনমনীয় অবস্থান-বিক্ষোভ অবশেষে সম্পূর্ণ তুলে নিয়েছে সিজেপি (CJP)। সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, কেন্দ্র সরকার তাদের একাধিক যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়েছে বলেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মেনে নেওয়া প্রধান দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম হলো তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া সমস্ত পুলিশি মামলা নিঃশর্তে প্রত্যাহার এবং দেশের সমগ্র পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনার জোরালো আশ্বাস।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty