ডাকাত পরিবারের রক্ত থেকে ইউপিএসসি জয়! নেদারল্যান্ডসের কোটি টাকার চাকরি ছেড়ে রেলের বড়কর্তা চম্বলের ছেলে

মধ্যপ্রদেশের চম্বল মানেই একসময় বন্দুকের গর্জন, গভীর গিরিখাত আর ডাকাতদের রোমহর্ষক ইতিহাস। সেই কুখ্যাত চম্বলেরই মোরেনা জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা UPSC-তে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দেব প্রভাকর সিং তোমর। পরিবারের রক্তে যেখানে লুকিয়ে ছিল ‘বাগী’ বা ডাকাতদের অন্ধকার ইতিহাস, সেই পরিবারেরই উত্তরসূরি হিসেবে নেদারল্যান্ডসের মোটা অঙ্কের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় ৬২৯তম স্থান অর্জন করে ভারতীয় রেলের ট্রাফিক সার্ভিসে (IRTS) নিজের পাকা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

দেব প্রভাকরের এই লড়াই আসলে তিন প্রজন্মের রূপকথার মতো বদলের গল্প। প্রায় ৭৫ বছর আগে পারিবারিক টানাপোড়েন ও স্থানীয় সংঘর্ষের জেরে তাঁর ঠাকুরদা বাধ্য হয়ে চম্বলের গিরিখাতে আত্মগোপন করেছিলেন, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বাগী’। সেই সিদ্ধান্তের জেরে গোটা পরিবার তীব্র দারিদ্র্যের মুখে পড়ে, দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর কাকাও সেই অপরাধের পথ বেছে নেন। তবে দেব প্রভাকরের বাবা এই অন্ধকার চক্র থেকে পরিবারকে বের করে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে গোয়ালিয়রে পালিয়ে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন এবং একজন শিক্ষক হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন জীবন শুরু করেন।

বাবার দেখানো সেই শিক্ষার আলোকেই নিজের জীবনের মূল মন্ত্র করে তোলেন দেব প্রভাকর। কোনো বড় কোচিং সেন্টারের সাহায্য না নিয়ে নিজের চেষ্টায় কঠোর পরিশ্রম করে তিনি আইআইটি রোপার-এ (IIT Ropar) ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ পান। পড়াশোনা সফলভাবে শেষ করার পর ইউরোপের নামী বহুজাতিক সংস্থা ‘ফিলিপস’-এ চাকরি পান এবং পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসে। আমস্টারডামের সাজানো-গোছানো জীবন ও নিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু দেশের মাটিতে ফিরে সিভিল সার্ভিসেসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সেবা করার জেদ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। সেই তীব্র মানসিক তাগিদেই ইউরোপের আরামদায়ক চাকরি ছেড়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং ইউপিএসসির কঠিন প্রস্তুতি শুরু করেন।

অবশ্য এই সাফল্য এক দিনে আসেনি। প্রথম দুটি প্রচেষ্টায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সামান্য নম্বরের জন্য তাঁকে ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়েছিল। এরপর তৃতীয়বারে ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছেও চূড়ান্ত মেধা তালিকায় নাম না আসার চরম হতাশা সইতে হয়। তবে হাল ছাড়েননি দেব। দিল্লিতে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি নিজের লড়াই চালিয়ে যান তিনি। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ৬২৯ অধিকার করে তিনি তাঁর জীবনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ করেন। বর্তমানে তিনি রেল মন্ত্রকের অধীনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ঠাকুরদার হাতে থাকা বন্দুক, বাবার বেছে নেওয়া শিক্ষার পথ এবং নাতির হাতে দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক সেবা—সব মিলিয়ে চম্বলের বুকে লেখা হলো পারিবারিক উত্তরণের এক অবিস্মরণীয় ও রোমহর্ষক ইতিহাস।