২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ক্ষত এখনও দগদগে। সেই ভয়াবহ হিংসায় ৫৩ জনের প্রাণহানি এবং শতাধিক মানুষের জখম হওয়ার ঘটনা আজও রাজধানীর বুকে এক কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সেই দাঙ্গার অন্যতম প্রধান মামলাগুলোতে ইউএপিএ (UAPA)-এর অধীনে ধৃত অভিযুক্তদের জামিনের আবেদনের শুনানি চলাকালীন দিল্লি হাইকোর্টে এক নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নিল মোদী সরকার। কেন্দ্রের আইনজীবীরা সাফ জানিয়ে দিলেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দাঙ্গার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জামিন নিয়ম, জেল ব্যতিক্রম’—এই নীতি কোনোভাবেই অন্ধভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।
হাইকোর্টে শুনানির সময় কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন, “বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে বলেই কি কসাবের মতো সন্ত্রাসবাদীকে জামিন দেওয়া হতো?” কেন্দ্রের এই মন্তব্য দিল্লি দাঙ্গার মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন মুম্বাই হামলার প্রসঙ্গ এবং হাফিজ সাঈদের কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা। আইনজীবীদের যুক্তি, যদি বিদেশ থেকে প্রমাণ জোগাড় করতে পাঁচ বছরও সময় লাগে, তবুও শুধু সময়ের অজুহাতে দাঙ্গার মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়া মানে ন্যায়বিচারের পরিহাস।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যে পরিকল্পিত ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল, তাকে সাধারণ কোনো রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে দেখছে না সরকার। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দাবি, এটি ছিল একটি সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র। অস্ত্র সরবরাহ, উস্কানিমূলক কার্যকলাপ এবং বড় ধরনের জনতাকে হিংসায় প্ররোচিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। কেন্দ্র মনে করছে, এই মামলাগুলো সাধারণ ফৌজদারি আইনের আওতায় বিচার করলে মূল অপরাধীদের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিভিন্ন সন্ত্রাস ও দাঙ্গা সংক্রান্ত মামলায় ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’-র দোহাই দিয়ে যেভাবে জামিনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্র। সরকারের বক্তব্য, যদি অভিযুক্তদের এই যুক্তিতে জামিন দেওয়া হয় যে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির, তবে তা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করবে। দাঙ্গায় মৃত ৫৩ জন মানুষের পরিবার এবং আহতদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এখানে সর্বাগ্রে।
কেন্দ্রের এই কঠোর অবস্থানের ফলে এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালত সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কী সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র যে বার্তা দিতে চেয়েছে তা স্পষ্ট—সন্ত্রাস ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এখন সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার। অভিযুক্তদের আইনি লড়াই দীর্ঘ হলেও, আদালত কি কেন্দ্রের এই যুক্তিতে সায় দিয়ে জামিনের আবেদন খারিজ করবে? এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই লড়াই এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে।





