জাহাজ কাটতেই বিষাক্ত গ্যাসের গ্রাস! সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে মর্মান্তিক মৃত্যু আট শ্রমিকের

জাহাজ ভাঙার কাজ চলাকালীন বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল বাংলাদেশের সীতাকুণ্ড। চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত আটজন শ্রমিকের প্রাণহানির খবর মিলেছে। পাশপাশি, নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত পাঁচজন শ্রমিক।
ঠিক কী ঘটেছিল ঘটনাস্থলে?
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্দরনগরী সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার ‘ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড অ্যান্ড রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি’তে এই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কাজ চলাকালীন হঠাৎ ইয়ার্ডের ভেতর থেকে তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পান সহকর্মীরা। তাঁরা দ্রুত ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং কয়েকজনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠান।
উদ্ধারাজে অংশ নেওয়া দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে ইতিমধ্যেই তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন।
নিয়মভঙ্গের অভিযোগ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
দমকল বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে গ্যাসমুক্ত করার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল। এর ফলেই বিষাক্ত গ্যাসের সরাসরি সংস্পর্শে আসা শ্রমিকরা ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন।
এদিকে চট্টগ্রামের সিনিয়র পুলিশ কর্তা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ইয়ার্ডটি এতদিন ‘গ্রিন’ ও নিয়ম মেনে চলা কারখানা হিসেবেই তালিকাভুক্ত ছিল। এতকিছুর পরেও কীভাবে এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ইয়ার্ডটির সার্বিক নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে একটি অডিটেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নেমে এসেছে চরম শোকের ছায়া
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পলাশ জলদাস। তাঁর স্ত্রী ভূমিকা জলদাস বর্তমানে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর এমন আকস্মিক ও অকালমৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ওই অসহায় নারীর একটাই প্রশ্ন, “এখন আমি কী করব?”
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের উপকূল জুড়ে থাকা এই ১৫ মাইল এলাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপব্রেকিং অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে কাজের অপর্যাপ্ত পরিবেশ এবং কঠোর নিরাপত্তার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব হয়ে আসছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ও পরিবেশবাদীরা। যদিও এই ভয়াবহ গ্যাস লিক ও হতাহতের ঘটনায় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।