“জানি আমাকে হত্যার পরিকল্পনা রয়েছে, তবুও যাব!” মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ ও শত মামলার পরেও কেন দেশে ফেরার তোড়জোড় শেখ হাসিনার?

২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণ-অভুত্থানের পর থেকে গত দুই বছর ধরে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই দেশের মাটিতে ১৫০টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে, বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং সম্প্রতি আদালতের তরফে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো কঠোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এমনকী দেশে ফিরলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার প্রকাশ্য হুমকিও রয়েছে। এত কিছুর পরেও কেন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ঢাকায় ফিরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি? আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘এএফপি’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এর ইঙ্গিত দিয়েছেন হাসিনা। তাঁর স্পষ্ট কথা— “আমি জানি সেখানে আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি সেখানে যাব, কারণ আমার নিজের জনগণ আমাকে ডাকছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার এই বিস্ফোরক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক চাল ও সুদূরপ্রসারী কৌশল। নিচে আলোচিত কারণগুলি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেন তিনি এত বড় ঝুঁকি নিতে চলেছেন:

১. ‘নির্বাসিত নেত্রী’র ইমেজ ঝেড়ে ফেলা এবং শেষ জীবন স্বদেশে উৎসর্গ: রাজনৈতিক জীবনের একেবারে অন্তিম পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর সম্পূর্ণ জীবনটাই উৎসর্গীকৃত বাংলাদেশের উন্নতির জন্য এবং তাঁর পিতা ছিলেন দেশের প্রতিষ্ঠাতা। নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের শেষ দিনগুলি বিদেশি মাটিতে একজন ‘পলাতক বা নির্বাসিত নেত্রী’ হিসেবে কাটাতে নারাজ তিনি। নিজের দেশেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে চান এবং ইতিহাসে নিজের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতে চান।

২. গণসমর্থন ও দলের অবস্থান শক্ত করা: যদিও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, তবুও দেশের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে তাঁর ও তাঁর দলের এখনও শক্তপোক্ত জনসমর্থন রয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বহু মানুষই গণতন্ত্রের জন্য আওয়ামী লীগের উপস্থিতি জরুরি বলে মনে করেন এবং দলটির ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলছেন। এই গণআবেগকে কাজে লাগাতে চান তিনি।

৩. ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই: শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পরিচয় বরাবরই একজন কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ নেত্রী হিসেবে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ছিল মূলত মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যেভাবে উগ্রপন্থী বা মৌলবাদী অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সেই প্রেক্ষাপটে নিজেকে একমাত্র শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চান তিনি।

৪. বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি: শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে নতুন রাজনৈতিক জমানায় দেশ পরিচালনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর দল ও সমর্থকদের দাবি, বর্তমান শাসনে দেশের উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে গেছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায় এবং ভারতের সঙ্গে বৈরিতার জেরে পোশাক শিল্পসহ অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। হাসিনা ফিরে এসে প্রমাণ করতে চান যে তাঁর আমলের শাসনব্যবস্থাই দেশের জন্য সঠিক ছিল।

৫. আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা: বর্তমান সরকার বা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এমন কিছু নতুন আইন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যা একসময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। দল সম্পূর্ণ মুছে যাওয়ার আগে নিজেই হাল ধরতে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক গণআন্দোলন গড়ে তোলার শেষ চেষ্টা করতেই তাঁর এই প্রত্যাবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে, শত মৃত্যুর হুমকি ও আইনি খাঁড়া ঝুললেও শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক বিশাল ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।