জাতীয় শিক্ষানীতিতে বড় পদক্ষেপ! রাজ্যে গঠিত হলো ২০ সদস্যের ‘স্টেট লেভেল টাস্ক ফোর্স’, দায়িত্বে কারা?

রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020) কার্যকর করা এবং সেই অনুযায়ী সঠিক সংস্কার কর্মসূচি তৈরি করার উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ২০ সদস্যের ‘স্টেট লেভেল টাস্ক ফোর্স’ গঠন করেছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর। বৃহস্পতিবার রাতে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এর আগে গত জুলাই মাসে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, জাতীয় শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নে রাজ্যের এই বিশেষ কমিটিতে আইআইটি খড়্গপুর-সহ বিভিন্ন খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ও শীর্ষ আধিকারিকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
নতুন গঠিত এই ২০ সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উচ্চশিক্ষা দফতরের প্রধান সচিব বিনোদ কুমারকে। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০ পর্যালোচনা কমিটির চেয়ারম্যান জগদেশ কুমারকে এই টাস্ক ফোর্সের উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে রাজ্য ও জাতীয় স্তরের শিক্ষানীতির রূপায়ণ এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই কমিটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই টাস্ক ফোর্সে শিক্ষা, প্রশাসন এবং শিল্প—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রের বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্র থেকে মোট ১০ জন প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ন্যাশনাল এডুকেশনাল টেকনোলজি ফোরামের চেয়ারম্যান অনিল ডি সহস্রবুদ্ধে, নীতি আয়োগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রাজীব কুমার সেন, আইআইটি খড়্গপুরের ডিরেক্টর অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আশুতোষ ঘোষ এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নির্মাল্য নারায়ণ চক্রবর্তী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও নীতি নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ বিশেষজ্ঞদের একই কমিটিতে রাখায়, কেবল তাত্ত্বিক নীতি নির্ধারণই নয়, বরং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সঠিক বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, গবেষণার মানোন্নয়ন, বহুমুখী শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের মতো গুরুুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি এই কমিটির আলোচনায় সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে।
শিক্ষাক্ষেত্রের পাশাপাশি শিল্পমহলের তিন জন বিশিষ্ট প্রতিনিধিকেও এই টাস্ক ফোর্সে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত এবং সেঞ্চুরি প্লাইবোর্ডস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সজ্জন ভজনকা, সেনকো গোল্ডের ডিরেক্টর সুবঙ্কর সেন এবং বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আইটি কমিটির চেয়ারপার্সন তথা শিক্ষা কমিটির সদস্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রের যোগসূত্রকে আরও মজবুত করা, ছাত্রছাত্রীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক আরও নিবিড় করার ক্ষেত্রে এই শিল্প প্রতিনিধিদের সুচিন্তিত মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। NEP 2020-তে মূলত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষাকে কর্মজগতের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের ৬ জন প্রতিনিধিকেও এই কমিটিতে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন দফতরের প্রধান সচিব রাজীব কুমার-সহ একাধিক পদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক রয়েছেন। প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নীতি গ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন দফতরের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথকে আরও প্রশস্ত করবে।
এই টাস্ক ফোর্সের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশিকাগুলিকে অন্ধভাবে বা সরাসরি কার্যকর না করে, তা রাজ্যের নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নির্দিষ্ট ও পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বর্তমান পরিকাঠামো, স্থানীয় প্রয়োজন এবং বাস্তব পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনা করে এনইপি ২০২০-এর বিভিন্ন দিক কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির মূল দায়িত্ব থাকবে এই কমিটির কাঁধেই।
প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নিয়ে গঠিত এই বহুমুখী কমিটি রাজ্যে জাতীয় শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে এক নতুন গতি দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ, তার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণেও এই টাস্ক ফোর্স সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরের এই দূরদর্শী উদ্যোগকে তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।