জমিদারি শেষ হলেও প্রথা অটুট! ডায়মন্ড হারবারের মণ্ডল বাড়িতে আজও কেন জ্বলে মহাসপ্তমীর হোম?

আকাশে শরতের মেঘ আর আগমনীর সুর জানান দিচ্ছে মা দুর্গার আগমন বার্তা। এই উৎসবের আবহে এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে ডায়মন্ড হারবারের বারদ্রোণ গ্রামের মণ্ডল বাড়ির দুর্গাপূজা। ১৬০ বছর আগে শুরু হওয়া এই পুজো আজও পুরোনো ঐতিহ্যের অনেকটাই ধরে রেখেছে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুতেই এসেছে পরিবর্তন।

ইতিহাসের কথা

১৮৬৬ সালে অবিভক্ত বাংলার নবাব হুসেন শাহের আমলে জমিদার অযোধ্যা রাম মণ্ডলের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা। লবণ ও তাঁতের ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন তিনি। ডায়মন্ড হারবার শহরের তৎকালীন নাম ছিল হাজিপুর। সেই সময়ের জৌলুস ছিল দেখার মতো। অযোধ্যা রামের বংশধর জমিদার গোলকচন্দ্র মণ্ডল সুবিশাল দালানবাড়ি তৈরি করেন, যেখানে পুজোর চার দিন গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য বসত কবিগানের আসর।

নিয়ম, প্রথা এবং পরিবর্তন

মণ্ডল বাড়িতে আজও বিশুদ্ধ নন্দীকেশ্বর রীতি মেনে দেবীর আরাধনা করা হয়। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং আর্থিক সংকটের কারণে পুরোনো অনেক নিয়মই এখন বন্ধ। একসময় অষ্টমীর সন্ধিপূজায় বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হতো এবং নবমীতে পাঁঠাবলিও দেওয়া হতো। কিন্তু ৫০-এর দশক থেকে সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে মহাসপ্তমীর দিন ব্রাহ্মণ ভোজন এবং প্রতিদিন গ্রামবাসীদের ভোজনের ব্যবস্থা।

তবে এই পুজোর একটি বিশেষ নিয়ম আজও অটুট রয়েছে। তা হলো, মহাসপ্তমীর দিন যে হোম-অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়, তা দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের আগে পর্যন্ত নেভানো হয় না। পরিবারের এক সদস্যের কথায়, “অতীতের সেই জৌলুস ফিকে হলেও প্রাচীন রীতিনীতি মেনেই আজও আমাদের পুজো চলে আসছে।”

অতীতের স্মৃতিচারণ

মণ্ডল বাড়ির ইতিহাস যেন এক রূপকথার গল্প। মূল প্রবেশপথে ছিল সুবিশাল সিংহদুয়ার, যেখানে বন্দুকধারী দারোয়ানরা দিনরাত পাহারা দিতেন। বাড়ির অভ্যন্তরে ৩৩টি ঘরে জমিদার, দারোয়ান এবং পালকি বাহকদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। এমনকি টাকাপয়সা ও সোনাদানা রাখার জন্য ছিল চারটি বিশাল লোহার সিন্দুক। এসব এখন শুধুই স্মৃতি।

মণ্ডল পরিবারের বহু সদস্য এখন কর্মসূত্রে দেশ-বিদেশে থাকেন, কিন্তু পুজোর চার দিন সকলেই একত্রিত হন। পারিবারিক এই মিলন ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য প্রতি বছর একটি বিশেষ পত্রিকাও প্রকাশিত হয়, যেখানে পুজোর নির্ঘণ্টের পাশাপাশি এর ইতিহাস তুলে ধরা হয়। এইভাবেই আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েও পুরোনো ঐতিহ্যের শিকড়কে ধরে রেখেছে মণ্ডল বাড়ির পুজো।