জন্মের পরিসংখ্যানে আকাশছোঁয়া লাফ! এক ধাক্কায় লাখ লাখ ভুয়ো নথির হদিশ মেলায় কোন বড় বিপদের মুখে রাজ্য?

পশ্চিমবঙ্গে ভুয়ো জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রের রমরমা কারবার এবং বেআইনি নথি তৈরির ছক রুখতে এবার রাজ্যজুড়ে এক মেগা ও বিশেষ যাচাই অভিযান শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গত বৃহস্পতিবার নবান্নে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল এই চাঞ্চল্যকর অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, জন্ম ও মৃত্যু নথিভুক্তিকরণের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে আরও বেশি স্বচ্ছ, ত্রুটিহীন ও নির্ভুল করে তুলতে বর্তমানে রাজ্যের সমস্ত জেলা, ব্লক, পুরসভা এবং পঞ্চায়েত স্তরে একযোগে তথ্য যাচাই ও শুদ্ধিকরণের কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছে। এই ব্যাপক অভিযানে রাজ্য পুলিশ, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য দফতর, পঞ্চায়েত এবং পুর প্রশাসন একেবারে যৌথভাবে মাঠে নেমে কাজ করছে। এমনকি, জন্ম এবং মৃত্যুর তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আর জি কর হাসপাতালেও পুলিশি অভিযান চলছে। বর্তমানে টালা থানার পুলিশ আর জি কর হাসপাতালের রেকর্ড সেকশন থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সংগ্রহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালাচ্ছে।
ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে রাজ্য সরকারের অত্যন্ত কঠোর নজরে এসেছে সীমান্তবর্তী তিন সংবেদনশীল জেলা—মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর এবং মালদায় ছড়িয়ে থাকা একাধিক সন্দেহজনক জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র। বিশেষ বিশেষ এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই তিন জেলাতেই ভুরি ভুরি অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তথ্য বলছে, মুর্শিদাবাদে সন্দেহজনক নথির সংখ্যা ২,৪০,৭৫৫; উত্তর দিনাজপুরে ১,৫৩,৬৫৮ এবং মালদায় এই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১,৪৮,৮৭৭-এ। প্রশাসনের তরফ থেকে অত্যন্ত কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সীমান্তবর্তী এই জেলাগুলির নথি আরও বিস্তারিতভাবে এবং কড়া নজরে পরীক্ষা করা হবে।
সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জন্ম নথিভুক্তকরণের সংখ্যায় বিগত কয়েক বছরে এক অবিশ্বাস্য ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা দেখে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে বিশেষজ্ঞদের। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ২০২৩ সালে জন্ম নথিভুক্তকরণের সংখ্যা ছিল ১,২১,৪৫৩, সেটাই লাফিয়ে ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৮১,৫৯১-এ। এরপর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা এক লাফে পৌঁছে যায় ১০,৫০,৪৫১-এ এবং চলতি বছরের শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই নথিভুক্ত হয়েছে ৫,১২,৬৩২টি জন্ম। মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান যে, জন্ম নিবন্ধনের এই অস্বাভাবিক ও আকাশছোঁয়া বৃদ্ধির পেছনের মূল কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এখানেই সবচেয়ে বড় মাপের কারচুপির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডিজিটাইজেশনের কাজ করতে গিয়ে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্যকর সব তথ্য হাতে এসেছে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত মোট ১১ লক্ষ ২৪ হাজার নথি ডিজিটাইজ করে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। তার মধ্যে শুধুমাত্র ১ লক্ষ ৮০ হাজার নথিতে বড় ধরনের অসঙ্গতি বা জাল হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থাৎ, যে সমস্ত নথি প্রাথমিকভবে যাচাই করা হয়েছে, তার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশই সম্পূর্ণ সন্দেহজনক। রাজ্যের সমস্ত পুরসভা, পুরনিগম ও পঞ্চায়েতে সংরক্ষিত পুরনো জন্ম ও মৃত্যু রেজিস্টারগুলি দ্রুত সংগ্রহ করে অত্যন্ত তৎপরতার সাথে স্ক্যান ও ডিজিটাইজ করার কাজ চলছে। এই কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিতে সেই পুরনো রেজিস্টারগুলি নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের নাগরিক পরিষেবা পেতে সামান্যতমও বিঘ্ন না ঘটে।
যাচাই প্রক্রিয়ার পরিধি আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়ে মুখ্যসচিব জানিয়েছেন যে, পরীক্ষামূলক প্রাথমিক যাচাইয়েই একাধিক জাল ও ভুয়ো শংসাপত্রের হদিস মিলেছে। ইতিমধ্যেই এই সমস্ত গুরুতর জালিয়াতির ঘটনায় কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে আধার কার্ড, পাসপোর্ট, রেশন কার্ড-সহ দেশের একাধিক অতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরিচয়পত্র তৈরি হয়ে থাকে। তাই এই সমস্ত গোপনীয় ও মৌলিক নথির নিখুঁত সত্যতা নিশ্চিত করা সরকারের কাছে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এখন থেকে ডিজিটাইজ করা পুরনো রেকর্ড এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেখার পরই জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যু করা হবে।
রাজধানী কলকাতাতেও এই বিশেষ অভিযান সমান তালে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কলকাতার পুরসভার বোরো-২ এলাকায় জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত পুরোনো ও নতুন নথি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখছে বড়তলা থানার পুলিশ। এই বিশেষ অভিযানে অভিজ্ঞ মহিলা পুলিশকর্মীরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। রাজ্য সরকার কঠোর বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, আগামী দিনে জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র ইস্যু করার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি কঠোর যাচাই ব্যবস্থা বা চেকিং চালু করা হবে। সমস্ত কর্পোরেশন, পুরসভা ও পঞ্চায়েতের জন্য একটি অভিন্ন নির্দেশিকা বা গাইডলাইন জারি করা হবে এবং স্থায়ী সরকারি কর্মীদের কাজের ভূমিকা আরও বেশি জোরদার করা হবে। সন্দেহজনক নথির কারবারীদের বিরুদ্ধে এই আইনানুগ সাঁড়াশি অভিযান আগামী দিনেও অবিরাম অব্যাহত থাকবে।