জনগণনার আগে এনআরসি আপডেট করতেই হবে! মণিপুরে মশাল মিছিল ঘিরে উত্তাল পরিস্থিতি

রবিবার মণিপুরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আন্দোলন আরও জোরদার করেছে ‘ক্যাম্পেন ফর জাস্ট অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন’ অর্থাৎ জেএফডি নামক একটি প্রভাবশালী সংগঠন। তাদের প্রধান এবং জোরালো দাবি হলো, রাজ্যে পরবর্তী জনগণনার কাজ শুরু করার আগে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসি বাধ্যতামূলকভাবে আপডেট করতে হবে। এই দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে রবিবার রাতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক মশাল মিছিল বের করা হয়।

জেএফডি-র এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ ডেপুটি কমিশনারদের কার্যালয়গুলির দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, অবিলম্বে জনগণনার বর্তমান কাজ স্থগিত রাখার জন্য সরকারের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে উরিপোক-কাংচুপ রোড, টিড্ডিম রোড, কোংবা রোড এবং খুরাই-লামলংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলির বরাবর বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে একটাই স্লোগান অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালোভাবে শোনা যায়—”যতক্ষণ না এনআরসি আপডেট হচ্ছে এবং ঘরছাড়া সমস্ত মানুষ উপযুক্ত পুনর্বাসন পাচ্ছেন, ততক্ষণ রাজ্যে কোনো জনগণনা হতে দেওয়া হবে না।” স্থানীয় মেইরা পাইবি গোষ্ঠীসহ একাধিক বিশিষ্ট সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরেই এই আন্দোলনকে আরও তীব্র রূপ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মশাল মিছিলকে কেন্দ্র করে যাতে রাজ্যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, তার জন্য পুলিশ প্রশাসন সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই আন্দোলনে উপত্যকা এবং পাহাড়ি জেলার বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় অভিমুখে মিছিল এবং মশাল র‍্যালির আয়োজন করে। তাদের সবার একটাই অভিন্ন স্লোগান ছিল, এনআরসি আপডেট না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যে কোনো জনগণনা করা চলবে না।

এর আগেও গত ১১ মার্চ মণিপুরে ঠিক একই ধরনের বিক্ষোভের চিত্র দেখা গিয়েছিল। সেদিনও জেএফডি-র ব্যানারে সাধারণ মানুষ রাজ্যের চলমান জনগণনা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ইম্ফলের ঐতিহাসিক ইমা মার্কেটে আয়োজিত সেই বিক্ষোভেও অবিকল একই দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়েছিল। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ বাধ্য হয়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার জন্য কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে, যার জেরে প্রায় পাঁচজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জেএফডি একটি সম্পূর্ণ “ন্যায্য ও স্বচ্ছ জনগণনা” এবং তার পাশাপাশি একটি স্বচ্ছ সীমানা নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার জোরালো দাবি জানাচ্ছে। সংগঠনের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অফ অর্গানাইজেশন নাওরিম ওয়াংগাম্বা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে সমস্ত বেআইনি অভিবাসীদের যথাযথভাবে চিহ্নিত না করা পর্যন্ত চলতি জনগণনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে হবে। ওয়াংগাম্বা অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেন, “যদি বেআইনি অভিবাসীদের সঠিকভাবে আলাদা না করেই জনগণনা চালানো হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে বৈধ ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে যেতে পারে। এই পদক্ষেপ কেবল সত্যের সঙ্গেই নয়, দেশের সংবিধানের সঙ্গেও চরম প্রতারণা এবং তার স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটাবে।”

তিনি আরও জানান যে, তাদের সংগঠন ইতিমধ্যে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। সেই স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মণিপুরে বেআইনি অভিবাসীদের চিহ্নিতকরণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এবং রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী চলমান সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যেন জনগণনা স্থগিত রাখা হয়। এই সমস্ত যৌক্তিক দাবিগুলির সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতি রেখেই জেএফডি জনগণনার আগে এনআরসি আপডেটের এই কড়া কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।