ছাত্ররা জাতির শত্রু নয়! মোদি সরকারের বিরুদ্ধে পুলিশি নিষ্ঠুরতা নিয়ে ফুঁসে উঠলেন সনিয়া গান্ধী!

কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও তীব্র ভাষায় তোপ দেগেছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধি। গত শুক্রবার এক কঠোর বিবৃতিতে তিনি সোচ্চার হয়ে বলেন যে, এ দেশের ছাত্রছাত্রীরা মূলত সরকারের কাছে তাদের সঠিক জবাবদিহি এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এর জবাবে বর্তমান মোদি সরকার অত্যন্ত কাপুরুষতা ও চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারের এই তীব্র সমালোচনায় সনিয়া আরও অভিযোগ করেন যে, এই দেশের ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান প্রশাসন তাদের আগামী দিনের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে রীতিমতো দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক অবক্ষয় ঘটানোর গুরুতর অভিযোগ তুলে সোনিয়া গান্ধি জানিয়েছেন যে, দেশের সচেতন ছাত্রছাত্রীরা বর্তমান মোদি সরকারের সমস্ত তথাকথিত ‘ভণ্ডামি’ আজ একেবারে ফাঁস করে দিয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ছাত্রছাত্রীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো এবং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত করা প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকারের একটি পরম নৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক কর্তব্য। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই কর্তব্য পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে সমস্ত ছাত্রবিক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা আসলে এই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দমনমূলক শক্তিরই একটি স্বাভাবিক পরিণতি মাত্র। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মনে শুধু চরম হতাশা এবং ক্ষোভ জাগিয়ে তুলছে। এর পাশাপাশি মোদি সরকারের চিরাচরিত ঔদ্ধত্য, জনসমক্ষে জবাবদিহি করার প্রবল অনিচ্ছা এবং গঠনমূলক আলোচনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি আরও দাবি করেছেন যে, দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি প্রশাসনিক আওতাধীন পুলিশ কর্মীদের দ্বারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর চালানো এই ‘নিষ্ঠুরতা’ বর্তমান সরকারের জমানায় একেবারেই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সোনিয়া স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২০ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ (CAA) এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি (NRC) বিরোধী আন্দোলনের সময় কীভাবে সশস্ত্র দিল্লি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে ঢুকে তণ্ডব চালিয়েছিল, তা এ দেশের মানুষ আজও ভুলে যায়নি। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, মোদি সরকার শুধু ভারতের সুপ্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থারই অবনতি ঘটায়নি, বরং চরম দায়মুক্তি, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং শোচনীয় অসংবেদনশীলতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করাকে তাদের প্রধান অভ্যাসে পরিণত করেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন যে, সর্বভারতীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অবনতির বিরুদ্ধে বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। শিক্ষার্থীদের এই সমস্ত দাবিগুলি অত্যন্ত সহজ-সরল এবং সুনির্দিষ্ট ছিল। ভারত সরকারের কাছে তারা শুধু স্বচ্ছতার সঙ্গে জবাবদিহি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সরকার তাদের সেই ন্যায্য দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে কেবল কাপুরুষতা ও নিষ্ঠুরতাই প্রদর্শন করেছে এবং তাদের দেশের শত্রু হিসেবে গণ্য করেছে।
গত ২০ জুলাইয়ের দিনটিকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত কলঙ্কজনক দিন হিসেবে বর্ণনা করে সোনিয়া বলেন যে, সেদিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী পৈশাচিক কায়দায় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলনকে হিংসাত্মকভাবে দমন করার চেষ্টা চালিয়েছিল। কংগ্রেস নেত্রী গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, পুলিশি হানায় একাধিক নিরীহ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এমনকি ছাত্রছাত্রীরাও পুলিশের এই দমনপীড়ন থেকে একচুলও রেহাই পায়নি, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে তাদের ওপর লাঠি চালিয়েছে। সোনিয়া আরও জোরালো ভাষায় বলেন, “দেশবাসী সেদিন তরুণ প্রজন্মের ওপর চালানো অত্যন্ত হতাশাজনক কিছু বিভীষিকাময় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে, যাদের তাজা শরীর পেলেট গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।” তাঁর দাবি, এই ধরনের নির্মম বলপ্রয়োগ নিঃসন্দেহে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যক্ষ অনুমোদনক্রমেই করা হয়েছিল।
তাঁর মতে, সেদিন ঘটে যাওয়া পৈশাচিক ঘটনার ভিডিও ফুটেজগুলি প্রতিটি দেশবাসীর স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। বর্তমান সরকার এবং তাদের অনুগত গণমাধ্যম প্রতিবাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ারকে ধামাচাপা দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে মনগড়া নানা গল্প তৈরি করছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে উচ্চস্বরে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সত্যকে তুলে ধরার, কারণ এরা অন্য কেউ নয়, এরা আমাদেরই নিজের ছেলেমেয়ে এবং দেশের তরুণ প্রজন্ম। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করে মোদি সরকার প্রতিবারই নিয়মিতভাবে দমনপীড়ন ও সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন সোনিয়া গান্ধি।