দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনাটি কি কেবল এক আকস্মিক অপরাধ ছিল, নাকি এর নেপথ্যে ছিল মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্রের বিকারগ্রস্ত মানসিকতা এবং বারবার ‘প্রত্যাখ্যাত’ হওয়ার প্রতিশোধের স্পৃহা? লালবাজারের গোয়েন্দারা এই প্রশ্নটি নিয়েই এখন गहन তদন্তে নেমেছেন। মূল অভিযুক্ত মনোজিতের মনস্তত্ত্ব, তার অতীতের কার্যকলাপ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা খতিয়ে দেখে তদন্তকারীরা এই সম্ভাবনার উপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন।
বারবার এড়িয়ে যাওয়া, নাকি পরিকল্পনার অংশ?
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুনের গণধর্ষণের ঘটনার মাত্র দু’দিন আগে, অর্থাৎ ২৩ জুন সোমবার, মনোজিৎ এবং তার ‘গ্যাং অফ এইট’ প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের ‘কোর্ট ভিজিট’-এর নামে কলেজে আসতে বলে। সেখানে নির্যাতিতা তরুণীকেও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। এর কিছুদিন আগেও মনোজিতের শাগরেদরা ইকো পার্কে একটি পিকনিকের আয়োজন করেছিল, যেখানেও অভিযোগকারিণী গরহাজির ছিলেন। এই ঘটনাগুলি ইতোমধ্যেই তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।
গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, ওই তরুণীকে লক্ষ্যবস্তু করলেও বারবার তাঁর এড়িয়ে যাওয়াতেই মনোজিতের মধ্যে এক ধরনের রাগ বা ক্ষোভের জন্ম নেয়। এর জেরেই কি পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে? এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে ধৃতদের দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ২৫ জুন বুধবার নির্যাতিতাকে কলেজে আসতেই হতো, কারণ সেদিন পড়ুয়াদের রেজিস্ট্রেশনের ফর্ম পূরণের কথা ছিল। নির্যাতিতা সেদিন কলেজে আসবেনই, এটা জেনেই মনোজিৎ তার পূর্ববর্তী ‘প্রত্যাখ্যান’-এর প্রতিশোধের ছক কষেছিল কিনা, সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: রাগের আগুনে ঘি
পুলিশের কাছে দেওয়া নির্যাতিতার লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২৫ জুন তিনি কলেজে এলে মনোজিতের সঙ্গী জ়ইব আহমেদ তাঁকে আলাদা করে জানতে চায় যে তিনি ‘দাদা’র (মনোজিৎ) প্রতি ‘লয়াল’ কিনা। পরে ইউনিয়ন রুমে ডেকে মনোজিৎ নিজেও একই প্রশ্ন করে। এমনকি, সে ওই তরুণীকে তার খুব পছন্দ বলে জানায় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। তখন অভিযোগকারিণী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, মনোজিৎকে বিয়ে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ তাঁর একজন প্রেমিক আছেন এবং তিনি তাকে খুব ভালোবাসেন।
আগের দু’বার তার ‘ডাক’ পেয়েও দু’টি ইভেন্টে গরহাজির থাকা এবং সবশেষে সামনে থেকে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ একেবারেই মানতে পারেনি মনোজিৎ। তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত ঘটনাপরম্পরা খতিয়ে দেখে মনে করছেন, এই রাগ থেকেই সেদিন তরুণীর ওপর নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়।
‘কোর্ট ভিজিট’ বনাম ‘প্রতারণা’: প্রভাবশালীর ক্ষমতা
কলেজ সূত্রের খবর, আইনের পড়ুয়াদের ‘কোর্ট ভিজিট’ বা হাতেকলমে কোর্টের কার্যক্রম দেখা এমনিতে বাধ্যতামূলক। তবে এটি কলেজ কর্তৃপক্ষের করানোর কথা। সেই অফিশিয়াল কাজটিও ‘প্রভাবশালী’ মনোজিৎকেই দিয়ে করানো হতো। এমনকি, স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের গুরুদায়িত্বও রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মনোজিতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
মনোজিতের বাহিনী গত ২৩ জুন বেলা ১২টা নাগাদ আলিপুর কোর্ট ভিজিটের কথা বলে পড়ুয়াদের। সেখানে অংশ নেওয়ার জন্য মনোজিতের পক্ষ থেকে তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল জ়ইব। রবিবার সে ওই তরুণীকে ফোন করলেও নির্যাতিতা আসতে রাজি হননি। তবে অন্য প্রায় ৭০ জন পড়ুয়াকে উবার শাটলে প্রথমে আলিপুর কোর্টের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঘণ্টাখানেক পরে পৌঁছয় মনোজিৎ। কিন্তু ওই ‘কোর্ট ভিজিট’ না করিয়ে মনোজিৎ পড়ুয়াদের বলে যে, সে তাদের কলকাতা হাইকোর্টে নিয়ে যাবে।
ওই ভিজিটে অংশ নেওয়া এক পড়ুয়ার কথায়, “আমাদের ইডেন গার্ডেন্সের পাশে হাইকোর্টের গেটের সামনে নামানো হয়। তারপরে দেখি, কিছু লোক কোথা থেকে তৃণমূলের ব্যানার নিয়ে হাজির হয়। মনোজিৎ আমাদের বলে, একটু হেঁটে নে। এটা কোর্ট ভিজিটের নাম করে এক ধরনের প্রতারণাই!” এই সময় পত্রিকার হাতে তৃণমূলের পতাকা নিয়ে হাঁটার ভিডিও রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
গ্রেফতারির পরেও প্রভাব: হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের অ্যাডমিন
এর আগে পুলিশও মনোজিৎকে ‘অত্যন্ত প্রভাবশালী’ বলে আদালতে দাবি করেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সে এতটাই প্রভাবশালী যে গ্রেফতার হওয়ার পরেও কলেজ পড়ুয়াদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাকেই অ্যাডমিন রেখে দেওয়া হয়েছে। ওই গ্রুপের বাকি দুই অ্যাডমিন হলো ‘গ্যাং অফ এইট’-এর সদস্য দুই মহিলা ‘আরএন’ ও ‘এএস’। এই গ্রুপেই মনোজিৎ পড়ুয়াদের জন্য নানা রকম নির্দেশ দিত। সূত্র মারফত খবর, সেই গ্রুপেও যোগ দিতে চাননি নির্যাতিতা, যা নিয়ে মনোজিতের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলেও অনুমান করা হচ্ছে।
নির্যাতনের পর কলেজের বাইরে ডিনার করা সহ সেই রাতে মনোজিতের কার্যকলাপের যোগসূত্র মেলাতে পুলিশ এখন জোরদার তদন্ত চালাচ্ছে। এই ঘটনা একদিকে যেমন এক নারীর ওপর পৈশাচিক আক্রমণের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে, তেমনই অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহারের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে।