চোর খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়ল ডাকাত! কাঁকুলিয়ার গুলি-বোমার তদন্তে পর্দাফাঁস দুর্নীতি-সিন্ডিকেটের

কাঁকুলিয়া রোডের গুলি-বোমা ও ভাঙচুরের ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় দাঙ্গা ছিল না, বরং তার গভীরে লুকিয়ে ছিল দুর্নীতি ও প্রতারণার এক বিশাল সিন্ডিকেট। ইডি (ED)-র তদন্তে উঠে এসেছে পুলিশ, প্রোমোটার এবং রাজনৈতিক নেতাদের এক নজিরবিহীন যোগসাজশ। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে একে ‘পিপিপি’ (PPP) মডেল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যা মূলত জমি দখল ও কাটমানির এক অন্ধকার সাম্রাজ্য।

ঘটনার সূত্রপাত ১ ফেব্রুয়ারি, যখন গোলপার্কের কাছে কাঁকুলিয়া রোড রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘটনার মূল হোতা হিসেবে উঠে আসে বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে ‘সোনা পাপ্পু’-র নাম। আশ্চর্যজনকভাবে, পুলিশ প্রশাসন এই অভিযুক্তকে ২ মাস পেরিয়ে গেলেও গ্রেফতার করেনি। বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে ইডি এই মামলার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। ১ এপ্রিল বালিগঞ্জ, ফার্ন রোড, পিকনিক গার্ডেন ও বেহালাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ইডি উদ্ধার করে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা এবং একটি লাইসেন্সবিহীন দেশি পিস্তল। ইডির দাবি, এই পিস্তলটিও ব্যবসায়ী জয় এস. কামদারের সংস্থা থেকে সোনা পাপ্পুর স্ত্রীর নামে কেনা হয়েছিল।

তদন্তের মোড় ঘুরে যায় যখন ইডি ব্যবসায়ী জয় এস. কামদার এবং কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে। ইডির হাতে আসা তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট থেকে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীদের দাবি, শান্তনু সিন্হা বিশ্বাস নিজের পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়ো এফআইআর (FIR) দায়ের করতেন, যা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। এই চাপের মুখে নামমাত্র মূল্যে জমি লিখে দিতে বাধ্য হতেন মালিকরা। আর এই জমি দখলের গোটা প্রক্রিয়ার সম্মুখভাগে থাকত সোনা পাপ্পু। সে তার বাহিনী নিয়ে এলাকায় ভয় ও ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করত।

অর্থাৎ, এই সিন্ডিকেটে প্রোমোটার যোগান দিত অর্থ, পুলিশ কর্তা দিত আইনি চাপ বা সুরক্ষা, আর সোনা পাপ্পু ছিল সেই পেশীশক্তি, যে সরাসরি জমি দখল করত। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। ইডির জেরায় এখন বেরিয়ে আসছে একে একে সব তথ্য। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, কেবল জয় কামদার বা ডিসি শান্তনু সিন্হা বিশ্বাসই নয়, এই চক্রের শিকড় আরও গভীরে। সোনা পাপ্পু, কামদার ও শান্তনু সিন্হাকে জেরা করে ইডি এখন সেই ‘বড় মাথা’দের খোঁজে নেমেছে, যাদের প্রশ্রয়ে এই অন্ধকার সিন্ডিকেট ফুলেফেঁপে উঠেছিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল জমি দখলের মামলা নয়, বরং রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়া এক গভীর দুর্নীতির ক্ষত। ইডির এই অভিযান এখন সেই ক্ষত সারিয়ে অপরাধীদের আসল মুখ সামনে নিয়ে আসছে। এখন দেখার, এই তদন্ত কত দূর পর্যন্ত পৌঁছায় এবং কারা কারা শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হন।