চোখের আলো ফেরাতে বড় আশা! দাতার কর্নিয়া ছাড়াই মিলবে দৃষ্টিশক্তি, খরচ কত জানেন?

কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলে এবং কোনো উপযুক্ত দাতার কর্নিয়া না পাওয়া গেলে, রোগীর সামনে চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের দৃষ্টিশক্তি হারায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ‘কর্নিয়াল ব্লাইন্ডনেস’ বা কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব বলা হয়। এর একমাত্র প্রচলিত চিকিৎসা হল কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যার জন্য মূলত একজন সুস্থ মৃত দাতার কর্নিয়ার প্রয়োজন হয়।

তবে আমাদের দেশে দাতার কর্নিয়ার অভাব অত্যন্ত তীব্র। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১ লক্ষ রোগীর কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংগৃহীত দাতার কর্নিয়ার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬২,৩৭০, ৬৬,৪৩৪ এবং ৬৯,৮৪৮টি। অর্থাৎ, গত তিন বছরে ১ লক্ষের চাহিদার বিপরীতে গড়ে মাত্র প্রায় ৬৬,০০০ কর্নিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলস্বরূপ, দাতার কর্নিয়ার অভাবে প্রতি বছর প্রায় ৩৪,০০০ নাগরিককে অন্ধত্বের অন্ধকারে জীবন কাটাতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ৩৯৬টি আই ব্যাংক (eye bank) এই সংকট দূর করার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

এই চরম সংকটের মাঝেই আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম কর্নিয়া। কৃত্রিম কর্নিয়ার কারিগরি বা বৈজ্ঞানিক নাম হল ‘কেরাটোপ্রোস্থেসিস’ (keratoprosthesis)। এটি কোনো মৃত দাতার শরীর থেকে নেওয়া টিস্যু বা কলা নয়, বরং বিশেষ এবং উন্নত উপাদান দিয়ে তৈরি একটি কৃত্রিম যন্ত্র বা ডিভাইস। এতে একটি স্বচ্ছ আলোক-উপাদান থাকে, যা আলোর পথ পুনরায় উন্মুক্ত করে দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় যে আলোর পথ ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার কারণে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, এই কৃত্রিম যন্ত্রটি সেই আলোকে পুনরায় রেটিনা পর্যন্ত পৌঁছনোর সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়।

দৃষ্টিশক্তি কীভাবে ফিরে পাওয়া যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম কর্নিয়ার স্বচ্ছ অংশটি চোখের ভেতরে সহজে আলো প্রবেশ করতে দেয়। এরপর সেই আলো সোজা রেটিনায় পৌঁছয় এবং সেখান থেকে অপটিক নার্ভের মাধ্যমে দৃশ্য-সংক্রান্ত সংকেত মস্তিষ্কে প্রেরিত হয়। মূলত, এটি রেটিনা বা অপটিক নার্ভের নিজস্ব কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষতি মেরামত করে না; বরং এটি ক্ষতিগ্রস্ত ও অস্বচ্ছ কর্নিয়ার পরিবর্তে আলো প্রবেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি পথ তৈরি করে দেয়।

তবে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত সব রোগীর জন্য এই পদ্ধতিটি উপযুক্ত বা ফলপ্রসূ নয়। এটি মূলত অত্যন্ত জটিল ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যেখানে সাধারণ বা প্রচলিত কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় অথবা তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যেসব রোগীর ক্ষেত্রে এই কৃত্রিম কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পদ্ধতিটি সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তারা আগের অন্ধ অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন।

অবশ্য, প্রতিটি রোগীই যে একেবারে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চোখের মতো নিখুঁত দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই। কারণ এর সামগ্রিক ফলাফল অনেকাংশেই নির্ভর করে রোগীর রেটিনা, অপটিক নার্ভ এবং চোখের অন্যান্য অংশের সুস্বাস্থ্য ও সার্বিক অবস্থার ওপর। তা সত্ত্বেও, কর্নিয়ার গুরুতর রোগের কারণে যারা আগে প্রায় কিছুই দেখতে পেতেন না, তাদের দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সুফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সর্বোপরি, এই চিকিৎসার খরচের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ‘কেরাটোপ্রোস্থেসিস’ (keratoprosthesis) পদ্ধতির জন্য সাধারণত ২ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে চিকিৎসকরা ধারণা করেন। তবে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্র বা ডিভাইস, হাসপাতালের ধরন এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রকৃত খরচের পরিমাণে তারতম্য হতে পারে।