চীনে মিলল ক্রিটেসিয়াস যুগের ডাইনোসরের ডিম, ইউরেনিয়াম-লেড ডেটিং-এ খুলল রহস্যের কপাট

বিজ্ঞানীরা এতদিন পরোক্ষ পদ্ধতির মাধ্যমে ডাইনোসরের ডিমের বয়স নির্ধারণ করতেন, যা প্রায়শই ভুল ফলাফল দিত। কিন্তু এবার সেই পুরোনো পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে এক নতুন কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন আর্থ সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায়, চীনা বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম-লেড ডেটিং ব্যবহার করে সরাসরি ডাইনোসরের ডিমের বয়স নির্ধারণ করেছেন। এই ডিমগুলি প্রায় ৮৫ মিলিয়ন বছরের পুরনো, যা ক্রিটেসিয়াস যুগের জলবায়ু এবং ডাইনোসরদের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচন করতে পারে।

‘পারমাণবিক ঘড়ি’: কী এই নতুন পদ্ধতি?
দীর্ঘদিন ধরে ডাইনোসরের ডিমের বয়স নির্ধারণ করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সাধারণত, বিজ্ঞানীরা ডিমের আশেপাশে থাকা আগ্নেয় ছাই বা খনিজ পদার্থের উপর নির্ভর করে বয়স নির্ণয় করতেন, যা সময়ের সাথে স্থান পরিবর্তন করতে পারায় নির্ভুল ফলাফল দিত না। কিন্তু এবার চীনা বিজ্ঞানীরা এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কার্বনেট ইউরেনিয়াম-লেড (U-Pb) ডেটিং নামে একটি কৌশল ব্যবহার করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত নির্ভুল পদ্ধতি, যা বয়স নির্ধারণের জন্য ইউরেনিয়ামের ক্ষয়কে ট্র্যাক করে। এই পদ্ধতিকে গবেষকরা “জীবাশ্মের জন্য পারমাণবিক ঘড়ি” বলে অভিহিত করেছেন।

কোথায় পাওয়া গেল এই জীবাশ্ম?
এই গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্মগুলো চীনের প্রথম জাতীয় ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্ম সংরক্ষণাগার কিংলংশানে পাওয়া গেছে। এখানে ৩,০০০টিরও বেশি ডিম তাদের আসল অবস্থানে সংরক্ষিত আছে। বিশ্লেষণ করা ডিমটি ২৮টি ডিমের একটি গুচ্ছের অংশ ছিল। বিজ্ঞানীরা ডিমের খোসার টুকরোগুলিতে একটি মাইক্রো-লেজার নিক্ষেপ করে কার্বনেট খনিজকে বাষ্পীভূত করেন। এরপর একটি ভর স্পেকট্রোমিটার ইউরেনিয়াম এবং সীসা পরমাণুর সংখ্যা গণনা করে কেবল ডিমের উপর ভিত্তি করে সঠিক বয়স নির্ণয় করে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও ডাইনোসরের অভিযোজন
এই গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে, ক্রিটেসিয়াস যুগ ছিল শীতলতার একটি সময়কাল, যা সম্ভবত ডাইনোসরদের বিবর্তনকে প্রভাবিত করেছিল। জীবাশ্মে পাওয়া ‘পি. টিউমিয়াওলিঙ্গেনসিস’ প্রজাতির ডিমের খোসার বিশেষ ছিদ্র কাঠামো থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, এটি সেই সময়ের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি বিবর্তনীয় অভিযোজন হতে পারে। তবে একইসঙ্গে এটি একটি বিবর্তনীয় মৃত প্রান্তকেও নির্দেশ করতে পারে, যেখানে এই প্রজাতি পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে সফলভাবে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

কেন এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই আবিষ্কারটি শুধুমাত্র ডাইনোসরদের বয়স নির্ণয়ের ক্ষেত্রেই বিপ্লব আনেনি, এটি তাদের বিবর্তন, বিলুপ্তি এবং সেই সময়ের পৃথিবীর পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কেও নতুন দিক উন্মোচন করেছে। সরাসরি ডিমের বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন আরও নির্ভুলভাবে ডাইনোসরদের জনসংখ্যার ইতিহাস, তাদের অভিযোজন কৌশল এবং কীভাবে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন তাদের টিকে থাকা বা বিলুপ্তিকে প্রভাবিত করেছে, তা জানতে পারবেন। এই গবেষণার ফলাফল আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসের আরও অনেক অজানা অধ্যায়কে জানার সুযোগ করে দেবে।