চার দশকের আনুগত্যের চরম অপমান! কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই ১টি ফেসবুক পোস্টের পরই কেন নড়েচড়ে বসল দিল্লি?

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক হাই-ভোল্টেজ রাজনৈতিক পালাবদলের আবহেই এবার রাজ্য রাজনীতিতে এক চরম বিস্ফোরক ও নজিরবিহীন মোড়। বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নজিরবিহীন ভরাডুবির পর যখন দলের অন্দরে তীব্র কোন্দল এবং ওলটপালট শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সবাইকে চমকে দিয়ে বারাসতের প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে আচমকা অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের ‘ওয়াই প্লাস’ (Y+) ক্যাটাগরির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা (Central Security) দিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। দিল্লির এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পর থেকেই সমগ্র রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন এবং জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।

এই ঘটনার পেছনে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয়ের পর থেকেই নবান্নের পক্ষ থেকে শাসকদলেরই একাধিক হেভিওয়েট নেতা, মন্ত্রী এবং বিদায়ী জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা একঝটকায় একপ্রকার কেড়ে নেওয়া বা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় স্বয়ং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, রাজ্যসভার সাংসদ রাজীব কুমার এবং দাপুটে বিধায়ক কুণাল ঘোষের মতো প্রথম সারির শীর্ষনেতারা রয়েছেন। নবান্নের তরফে এই সমস্ত হাই-প্রোফাইল নেতাদের নিরাপত্তা বলয় ও ভিআইপি কনভয় একপ্রকার ছেঁটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু যেখানে খোদ কলকাতার প্রভাবশালী নেতাদের নিরাপত্তা কমছে, সেখানে উত্তর ২৪ পরগনার এক তৃণমূল সাংসদের জন্য দিল্লির তরফে কেন্দ্রীয় ক্যাটাগরির নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে সাধারণ রাজনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখতে নারাজ ওয়াকিবহাল মহল।

আসলে, এই চরম নাটকীয়তার সূত্রপাত ঘটে গত কয়েকদিন আগে, যখন লোকসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মুখ্য সচেতক’ (Chief Whip) পদ থেকে ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে আচমকা সরিয়ে দেয় তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। গত বছরের আগস্ট মাসে সংসদীয় দলের চিফ হুইপ পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, যার পর সেই সম্মানজনক চেয়ারে বসানো হয়েছিল কাকলিকে। কিন্তু এবারের বিধানসভা ভোটে দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর সংগঠনে বড়সড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে কাকলিকে সরিয়ে ফের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই আক্রমণাত্মক পদে ফিরিয়ে আনা হয়। দলের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে নিজের ক্ষোভ ও উষ্মা চেপে রাখতে পারেননি চার দশকের এই লড়াকু নেত্রী। তিনি সরাসরি নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক হ্যান্ডেলে একটি বিস্ফোরক পোস্ট করেন। অত্যন্ত অভিমানের সুরে তিনি লেখেন, “৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।” এই একটি পোস্টেই স্পষ্ট হয়ে যায় দলের সঙ্গে তাঁর তৈরি হওয়া গভীর দূরত্ব।

কাকলির এই ফেসবুক পোস্টের ঠিক পরেই আসরে নামে দিল্লি। সোমবার সকাল থেকেই মধ্যমগ্রামে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বাসভবনে এসে পৌঁছায় কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী বা সিআইএসএফ (CISF)-এর জওয়ানরা। সারা বাড়ি মুড়ে ফেলা হয় কড়া নিরাপত্তা বলয়ে। হঠাৎ করে পাড়ার সাংসদের বাড়িতে বন্দুকধারী কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুটের শব্দ শুনে মধ্যমগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের মনেও হাজারো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, সোমবার বিকেলে কাকলি যখন মধ্যমগ্রাম-বারাসাত সাংগঠনিক জেলা কার্যালয়ে একটি দলীয় বৈঠকে যোগ দিতে যান, সেখানেও কেন্দ্রীয় সুরক্ষাকর্মীদের কড়াকড়ি ও বেষ্টনী দেখে দলের অন্যান্য কর্মীদের চোখ কার্যত কপালে ওঠে।

তৃণমূলের একজন বর্তমান সাংসদ কেন হঠাৎ করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের থেকে এই বিশেষ সুরক্ষা পেলেন, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। তবে এই বিষয়ে এক চরম ইঙ্গিতপূর্ণ ও বিস্ফোরক দাবি করেছেন রাজ্য বিজেপির প্রভাবশালী নেতা রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট দাবি করেছেন, তৃণমূলের বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে কাকলিদেবীর নিজের দলের অন্দরেই হয়তো কোনো বড়সড় ‘থ্রেট’ বা প্রাণনাশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর সেই অভ্যন্তরীণ হুমকির কথা আঁচ করেই কেন্দ্র তড়িঘড়ি তাঁর সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। অন্যদিকে, রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, দেশের যেকোনো নাগরিক বা জনপ্রতিনিধির ওপর কোনো নির্দিষ্ট হুমকি বা গোয়েন্দা ইনপুট থাকলে কেন্দ্র এই নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরজি কর আবহে দল বিরোধী ক্ষোভ এবং এই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা আদতে বাংলায় কোনো বড়সড় রাজনৈতিক দলবদলের পূর্বাভাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে না তো? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে গোটা রাজ্য।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy