চার দফা দাবিতে অনড় লাদাখ! রাজ্যত্ব না দিলে শান্তি নেই, কেন কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে জনতার?

লাদাখের রাজধানী লেহ শহরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া সহিংস বিক্ষোভে অন্তত চারজন বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, এই চারজনই পুলিশের পাল্টা অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনার পর লেহ ও কারগিল—উভয় জেলাতেই কঠোর কারফিউ ও বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আজ ও আগামীকাল লাদাখের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করবে বলে জানা গেলেও, নিহতদের পরিবার ও বিক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নিহতদের পরিচয় ও স্থানীয়দের দাবি
প্রশাসনিক সূত্রে নিহত চারজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। তারা সবাই লেহ জেলার বাসিন্দা ছিলেন:
থারচিন (৪৬), স্কুর বুচান গ্রামের বাসিন্দা।
জিগমেত দর্জে (২৫), খর্নাল্লিং গ্রামের বাসিন্দা।
স্তানজিন নামগিয়াল (২৩), ইগু গ্রামের বাসিন্দা।
দাদুল (২০), আর্যন ভ্যালির হানু গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বেসামরিক নাগরিকরা পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের শিকার হয়েছেন।
সংঘর্ষের নেপথ্যে ‘আরব বসন্ত’ মডেলের উস্কানি?
গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে জলবায়ু কর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে লাদাখকে বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার দাবিতে একটি অনশন কর্মসূচি চলছিল। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে লাদাখ অটোনোমাস হিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ বাঁধে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং সরকারি দপ্তর, বিজেপি কার্যালয় ও একটি পুলিশ গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে যে, সোনম ওয়াংচুক “আরব বসন্ত-ধাঁচের আন্দোলন” ও “নেপালের জেন জেড বিক্ষোভ” এর উদাহরণ টেনে তরুণদের উস্কে দিয়েছেন। মন্ত্রকের দাবি, বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়, যাতে অন্তত ৩০ জন পুলিশ ও সিআরপিএফ সদস্য আহত হন।
লাদাখের প্রধান চার দফা দাবি
কেন্দ্রের অভিযোগ সত্ত্বেও, লাদাখের নেতাদের উত্থাপিত মূল চার দফা দাবি এখনো পূরণ করা হয়নি:
১. কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের রাজ্যের মর্যাদা।
২. সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তি (Sixth Schedule)।
৩. স্থানীয়দের জন্য চাকরিতে সংরক্ষণ।
৪. জমির একচেটিয়া অধিকার।
লেহ ও কারগিলে কঠোর বিধিনিষেধ
২৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার লেহ ও কারগিল জেলায় সম্পূর্ণ বন্ধ পালিত হচ্ছে। বাজার, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন সম্পূর্ণভাবে থমকে গেছে।
কারগিলের ডেপুটি কমিশনার রাকেশ কুমার এবং লেহ-এর জেলা শাসক রোমিল সিং দঙ্ক উভয়েই ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সনহিতা (BNSS) ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ (যা পুরোনো CrPC ১৪৪-এর আধুনিক রূপ)-এর অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আদেশ অনুযায়ী:
কোনও মিছিল, সভা, বা প্রকাশ্য বিক্ষোভের জন্য পূর্বানুমতি প্রয়োজন।
মাইক বা লাউডস্পিকারের ব্যবহার নিষিদ্ধ।
পাঁচ জনের বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
শান্তি ভঙ্গ করতে পারে এমন যে কোনও বক্তব্য, বিবৃতি বা বার্তা প্রকাশও নিষিদ্ধ।
প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করলেও, স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন যে সরকারের কঠোর মনোভাব এবং দাবিগুলোতে অনীহাই এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নিহতদের শোক ও ক্ষোভের কারণে আগামী দিনগুলিতে এই সীমান্ত অঞ্চলে অনিশ্চয়তার আবহ জারি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।