চলন্ত ট্রাকে গোপন চেম্বার! ভিনরাজ্য থেকে মদতের জাল ছড়ানো বিশাল মাদকচক্রের পর্দাফাঁস করল এসটিএফ

রাজ্যে মাদক পাচার রোধে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। পুরুলিয়া জেলা পুলিশের সঙ্গে অত্যন্ত নিখুঁত ও গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে একটি সুসংগঠিত আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারচক্রের সম্পূর্ণ পর্দাফাঁস করেছে তদন্তকারী দল। এই সাঁড়াশি অভিযানে খোদ গোয়েন্দাদের চোখ কপালে তুলে দিয়ে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক, যা রাজ্যজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা মহলে প্রবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

গত সোমবার গভীর রাতে পুরুলিয়া জেলার অন্তর্গত বেলকুড়ি টোল প্লাজার ঠিক পাশেই জাতীয় সড়ক ১৮ (NH-18)-এ সন্দেহভাজন একটি ট্রাককে গতিরোধ করে থামায় যৌথ বাহিনী। এরপর ট্রাকটিতে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালানো হলে চালকের আসনের ঠিক পিছন দিকে একটি অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি গোপন চেম্বারের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে অনুমান করা হচ্ছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে ধুলো দিতে এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারের উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ গোপন চেম্বারটি তৈরি করা হয়েছিল।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের নজরে আসে যে, ওই মাদকবোঝাই ট্রাকটির নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য ওড়িশা থেকে আসানসোলের অভিমুখে আরও দুটি এসকর্ট গাড়ি সঙ্কেত দিয়ে এগিয়ে চলেছে। পুলিশি তল্লাশির মুখে সন্দেহ আরও গভীর হওয়ায় ওই এসকর্ট গাড়ি দুটিকেও তৎক্ষণাৎ আটক করা হয়। সবমিলিয়ে একটি ট্রাক এবং দুটি এসকর্ট গাড়ি থেকে মোট সাতজন পাচারকারীকে পাকড়াও করা হয়েছে। ধৃতদের থানায় নিয়ে এসে দফায় দফায় জেরা করে এই আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারচক্রের মূল রুট, বিশাল নেটওয়ার্ক এবং এর পেছনে থাকা মূল চক্রীদের নাম ও ঠিকানা বের করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশের জোরালো দাবি, এই কুখ্যাত চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে অবৈধ মাদক পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ গাঁজা, পাচারের সুনির্দিষ্ট রুট এবং এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা বর্তমানে নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী অফিসারদের মতে, এই সফল অভিযানের সূত্র ধরে আগামী দিনে আরও বহু বড় মাপের মাদকচক্রের হদিশ মিলতে পারে।

এই অভাবনীয় সাফল্যের পর মঙ্গলবার সকালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (X)-এ একটি বিশেষ পোস্টের মাধ্যমে পুরো অভিযানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কলকাতা পুলিশের এসটিএফ এবং পুরুলিয়া জেলা পুলিশের প্রতিটি স্তরের আধিকারিকদের অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন যে, দুই বাহিনীর নিখুঁত সমন্বিত তৎপরতা এবং ঝটিকা পদক্ষেপের ফলেই এই বিশাল আন্তঃরাজ্য মাদকচক্রের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছে। তাঁদের এই পেশাদারিত্ব ও সততা আগামী দিনে যুবসমাজকে রক্ষা করবে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।

রাজ্য সরকারের তরফ থেকে বারংবার কঠোর বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, মাদক পাচার, সংগঠিত অপরাধ এবং যেকোনো ধরনের সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রশাসন চিরকালই জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে। বিশেষ করে উঠতি যুবসমাজকে সর্বনাশা মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তঃজেলা সমন্বয় এবং ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও আরও বহুগুণ জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের উচ্চস্তর থেকে কড়া ইঙ্গিত মিলেছে। পুলিশ মহলের মতে, এই অভিযান রাজ্যের ইতিহাসে মাদকবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।