ঘরে পড়ে থাকা সোনাতেই বাজিমাত! অর্থনীতিতে বড় চমক আনতে চলেছে মোদী সরকার

ভারতের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে এবং গৃহস্থালির অলস পড়ে থাকা বিপুল সোনাকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের পথে মোদী সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার ‘গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম’ (GMS)-এ স্বর্ণকার বা জুয়েলার্সদের সরাসরি ‘সংগ্রহ ও অ্যাগ্রিগেশন পার্টনার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগস্ট মাসেই এই পুনর্গঠিত প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হতে পারে বলে সরকারি সূত্রের খবর।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সোনার বাজার। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সোনা কেবল অলংকার নয়, বরং আভিজাত্য ও ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পরিবারগুলো যে সোনা জমিয়ে রাখেন, তার পরিমাণ আনুমানিক ৩০ হাজার টন। কিন্তু এই বিপুল সম্পদ দীর্ঘ সময় ধরে লকার বা সিন্দুকে তালাবন্দি হয়ে পড়ে থাকে, যা কোনো অর্থনৈতিক উপকারে আসে না। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিম চালু করলেও, বিগত বছরগুলিতে মাত্র ৩৯ টন সোনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট মজুতের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
এই স্বল্প সাফল্যের মূল কারণ ছিল সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়ার জটিলতা। ওজন যাচাই, সোনার বিশুদ্ধতা নির্ধারণ এবং আইনি কাগজপত্রের ঝক্কি এড়াতে মানুষ সোনা ব্যাঙ্কে জমা দিতে অনাগ্রহী ছিলেন। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় এই সমস্যার সহজ সমাধান খোঁজা হয়েছে। যেহেতু স্থানীয় জুয়েলার্সদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, তাই তাদের মাধ্যমেই এই সোনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। জুয়েলার্সরা গ্রাহকের কাছ থেকে সোনা সংগ্রহ করে ব্যাঙ্কে পৌঁছে দেবেন এবং সার্টিফিকেশনের সমস্ত দায়িত্ব পালন করবেন। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি গ্রাহকবান্ধব ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের পেছনে সরকারের তিনটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরীণ অলস সোনার ভাণ্ডারকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, ভারতের সোনা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। ভারত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সোনা বিদেশ থেকে আমদানি করে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। অভ্যন্তরীণ এই সম্পদকে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় আনতে পারলে আমদানি বিল কমানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সোনা আসার ফলে তা ঋণদান, গয়না শিল্প বা অন্যান্য উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করবে।
স্বর্ণকার সংগঠনগুলি এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি কেবল অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, বরং ছোট-বড় সব জুয়েলার্সের ব্যবসায় নতুন গতি আনবে। তবে সোনার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারও এই দিকগুলো নিয়ে সচেতন এবং নিয়মকানুন আরও সহজ করার ওপর জোর দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, ঘরে পড়ে থাকা সোনাকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করার এই উদ্যোগ ভারতের আর্থিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।