ঘণ্টা-কাঁসরের সঙ্গে কোরান পাঠ! সাড়ে তিনশো বছরের সম্প্রীতির টানে ভাইরাল হুগলির এই বিখ্যাত পুজো

সন্ধ্যা নামলেই দুর্গামণ্ডপে বেজে ওঠে ঘণ্টা, শঙ্খ আর কাঁসরের ধ্বনি। সেই সুরের সঙ্গেই বাতাসে মিশে যায় পবিত্র কোরান পাঠের মধুর আওয়াজ। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি সমান মর্যাদায় চলে পীরের প্রার্থনা। ধর্মের পরিচয় আলাদা হলেও প্রার্থনার মুহূর্তে যেন একসূত্রে বাঁধা পড়ে গোটা গ্রাম। হুগলির আরামবাগের ভালিয়া গ্রামের সরকার বাড়ির দুর্গাপুজোয় এ ভাবেই প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে নির্বিঘ্নে বয়ে চলেছে অকৃত্রিম সম্প্রীতির এক বিরল ঐতিহ্য। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী—পুজোর এই তিন দিন সন্ধ্যার আরতির আগে পীরের আরাধনা ও কোরান পাঠের প্রাচীন রীতি আজও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। জাঁকজমকের চেয়ে ঐতিহ্য আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাকেই যেখানে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেই সরকার বাড়ির পুজো আজকের দিনেও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী।

কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে মল্ল রাজাদের আমলে ভালিয়া গ্রামে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাবুরাম সরকার। সেই সময় গোটা এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি পীরের মাজার। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গ্রামের সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুদৃঢ় সহাবস্থানের সম্পর্ক। জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজোয় দুই সম্প্রদায়ের মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিতেন। পুজোর প্রসাদ গ্রহণ থেকে শুরু করে আনন্দ উৎসবে অংশ নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই ছিল সবার অবাধ যাতায়াত। কিন্তু কোনও এক বছর দুর্গাপুজোর সময়ে বাবুরাম সরকার লক্ষ করেন যে, মুসলিম প্রজাদের একাংশ আর উৎসবে আসছেন না। প্রজাদের সেই অনুপস্থিতি সহজেই নজর এড়ায়নি দূরদর্শী জমিদারের।

কথিত রয়েছে, এর পরেই তিনি এক মৌলবিকে ডেকে দুর্গামন্দিরের সামনে কোরান পাঠের সুব্যবস্থা করেন। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম প্রজারাও যাতে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় পুরোপুরি বজায় রেখেই পুজোর আনন্দের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। আর সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ থেকেই শুরু হয় এক অনন্য ও যুগান্তকারী প্রথা। দেবীমন্দিরে পুজোর ঘণ্টা, শঙ্খ ও কাঁসরের ধ্বনির সঙ্গে একাকার হয়ে যায় কোরান পাঠের সুর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুগ বদলেছে, সমাজেও এসেছে বহু পরিবর্তন, কিন্তু বিন্দু মাত্র বদলায়নি সেই শতাব্দীপ্রাচীন রীতি।

সরকার পরিবারের বর্তমান বংশধরদের দাবি, জমিদার আমলের সেই সোনালী দিন থেকে শুরু হওয়া এই মহান প্রথা আজও একইভাবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের পীরের বংশধরেরাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পবিত্র দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন। বর্তমানে শেখ মতলেব প্রায় ৩০ বছর ধরে সরকার বাড়ির দুর্গাপুজোয় পীরের আরাধনা করে আসছেন। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যার আরতির ঠিক আগে থালায় নানা ফল নিয়ে তিনি পীরের প্রার্থনায় বসেন এবং কোরান পাঠ করেন। দুর্গামণ্ডপে যখন মা দুর্গার আরাধনা চলে, তখন তারই পাশে অন্য ধর্মের এই প্রার্থনাও সমান মর্যাদায় নিজের জায়গা করে নেয়।