গোটা দেশকে গর্বিত করে আন্তর্জাতিক যাত্রা: করাচি থেকে মুম্বই, কীভাবে টাটা এয়ার সার্ভিসেস থেকে তৈরি হল আজকের এয়ার ইন্ডিয়া?

এক নতুন যুগের সূচনা। ১৯৩২ সালের ১৫ অক্টোবর এক শীতের সকালে করাচি থেকে তৎকালীন বোম্বাই (এখন মুম্বই) পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক বিমানযাত্রার মাধ্যমে ভারতীয় বিমান শিল্পের জন্ম হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে এয়ার ইন্ডিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই উদ্বোধনী ফ্লাইটটি পাইলট করেছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা জে. আর. ডি. টাটা (J.R.D. Tata) স্বয়ং। তিনি একটি একক-ইঞ্জিন বিশিষ্ট ‘হ্যাভিল্যান্ড পাস মথ’ (Havilland Puss Moth) বিমান নিয়ে করাচি থেকে আমেদাবাদের হয়ে মুম্বইয়ে পৌঁছান। এই যাত্রায় কোনো যাত্রী ছিল না, ছিল মাত্র ২৫ কেজি চিঠি বা ডাক। এই চিঠিগুলি ব্রিটেনের রাজকীয় বিমান সংস্থা ‘ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ’ লন্ডন থেকে করাচি পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল।

লাইসেন্স নম্বর ১ থেকে শুরু
জে. আর. ডি. টাটার বিমান চালানোর গল্প শুরু হয়েছিল এর তিন বছর আগে। ১৯২৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর প্রথম একক ফ্লাইট সম্পন্ন করে ১ নম্বর শংসাপত্র সহ উড়ানের লাইসেন্স অর্জন করেন। এরপর ১৯৩২ সালে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা হিসেবে টাটা এয়ার সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মূলত অভ্যন্তরীণ ডাক ও যাত্রী পরিবহণের কাজ শুরু করে।

প্রথম দিকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে টাটা এয়ার সার্ভিসেস চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। দেশের প্রথম ফ্লাইট হয়েছিল করাচির ড্রিগ রোড বিমানবন্দর এবং মুম্বইয়ের জুহু এরোড্রোম-এর মধ্যে। সেই সময় দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল।

তাৎকালীন ব্রিটিশ সরকার টাটা এয়ারলাইন্সকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেয়নি, প্রতিটি চিঠির জন্য মাত্র চার আনা করে দিত, যার জন্য ডাকটিকিট লাগাতে হত। এমনকি যখন জে. আর. ডি. বিমান সংস্থা নিয়ে আগ্রহ দেখালেন, তখন তাঁর কোম্পানিও এর সাফল্য নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না।

বৃষ্টির চ্যালেঞ্জ এবং মুনাফা
পরিচালনার প্রথম বছরে, টাটা এয়ার সার্ভিসেস ২,৫৭,৪৯৫ কিলোমিটার উড়েছিল, বহন করেছিল ১৫৫ জন যাত্রী এবং ১০ টনেরও বেশি ডাক। মাত্র ২ লক্ষ টাকা খরচে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি প্রথম বছরেই ৬০,০০০ টাকা লাভ করে।

প্রথম দিকে, টাটা এয়ারলাইন্স জুহুর কাছে একটি মাটির ঘর থেকে কাজ করত এবং সংলগ্ন একটি মাঠকে ‘রানওয়ে’ হিসেবে ব্যবহার করত। বর্ষাকালে এই মাঠ জলমগ্ন হয়ে যেত। সেই সময় টাটা এয়ারলাইন্সের দুটি ছোট একক-ইঞ্জিনের বিমান, দুজন পাইলট এবং তিনজন মেকানিক ছিল। জল জমার ক্ষেত্রে জে. আর. ডি. তাঁর বিমান পুনে থেকে চালাতেন। পরে তারা শ্রীলঙ্কা এবং দিল্লি পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিষেবা শুরু করে।

টাটারা যখন বুঝতে পারলেন যে বিমান ব্যবসা ভালোভাবে চালানো সম্ভব, তখন তাঁরা একটি ছয়-সিটের বিমান ‘মাইয়েল মার্লিন’-এর সাহায্যে মুম্বই থেকে ত্রিভান্দ্রম পর্যন্ত প্রথম যাত্রী ফ্লাইট শুরু করেন। প্রথম দিকে যাত্রীদের ডাকের বস্তার উপরেই বসতে হতো।

এয়ার ইন্ডিয়া এবং জাতীয়করণ
জে. আর. ডি. টাটার বিমান চালনার প্রতি গভীর আগ্রহের কারণেই টাটা এয়ার সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে টাটা এয়ারলাইন্স রাখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং নাম হয় এয়ার ইন্ডিয়া লিমিটেড।

স্বাধীনতার ঠিক পরে, ১৯৪৮ সালে এয়ার ইন্ডিয়া আন্তর্জাতিক উড়ান শুরু করে। ওই বছর ৮ জুন, একটি ৪০-সিটের লকহিড এল-৭৪৯ কনস্টেলেশন ‘মালাবার প্রিন্সেস’ বিমান কায়রো এবং জেনেভাতে থেমে ৮,০৪৭ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মুম্বই থেকে লন্ডনে এক অসাধারণ যাত্রা শুরু করে।

১৯৫৩ সালে এয়ার ইন্ডিয়াকে জাতীয়করণ করা হয় এবং জে. আর. ডি. টাটা কোম্পানির প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।

প্রায় সাত দশক পরে, প্রতিদ্বন্দিতা এবং খারাপ সিদ্ধান্তের কারণে লোকসানে থাকা এয়ার ইন্ডিয়ার মালিকানা সরকার বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালে টাটা গোষ্ঠী আবারও এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, যা ভারতীয় বিমান ইতিহাসের এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করে।