গুরুগ্রামের ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে দেড়শো বাংলাভাষী শ্রমিক মুক্ত, সাংসদ ইশা খান চৌধুরী ও রবিকুল হোসেনের তৎপরতায় স্বস্তি

হরিয়ানার গুরুগ্রামে বাংলাভাষী শ্রমিকদের হেনস্তা এবং ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিলেন মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রের সাংসদ ইশা খান চৌধুরী এবং অসমের ধুবড়ি কেন্দ্রের সাংসদ রবিকুল হোসেন। কোনো আবেদন বা আন্দোলন ছাড়াই তাঁরা নিঃশব্দে গুরুগ্রামে পৌঁছে যান এবং তাঁদের তৎপরতায় প্রায় দেড়শো বাংলা ও অসমের বাংলাভাষী শ্রমিক গুরুগ্রামের একটি ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হেনস্তার অভিযোগ:
সাংসদ ইশা খান চৌধুরী জানান, মালদা জেলার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কর্মরত, এবং তাদের শ্রমে বিভিন্ন রাজ্যে নির্মাণ ও টাওয়ারের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। অনেক শ্রমিক হোটেল বা গৃহ পরিচারক-পরিচারিকার কাজও করেন। অথচ শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এই শ্রমিকদের এখন প্রবল সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বাংলা এবং অসমের প্রায় দেড়শো বাংলাভাষী শ্রমিককে হরিয়ানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে গুরুগ্রামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বেআইনি ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে রেখেছিল।” ইশা দৃঢ়ভাবে জানান যে, এই শ্রমিকদের প্রত্যেকের কাছে বৈধ ভোটার ও আধার কার্ড সহ অন্যান্য পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও হরিয়ানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেছে, যা ভারতীয় সংবিধানে নির্ধারিত নাগরিক ও মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ:
ইশা খান চৌধুরী সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ভারতের যেকোনো প্রান্তে বসবাস, কাজ ও ব্যবসা করার অধিকার রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “শুভঙ্কর সরকার নামে মুর্শিদাবাদ জেলার এক ব্যক্তি তথ্য জানার অধিকার আইনে ভারত সরকারের কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তাঁকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, ১৯৫৫ সালের সিটিজেন অ্যাক্টের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নরেন্দ্র মোদী জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক। তাই তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখানোর প্রশ্ন আসে না। আমার প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী যদি জন্মসূত্রে ভারতীয় হতে পারেন, তবে এই শ্রমিকরা একইভাবে ভারতীয় হবেন না কেন? কেন তাঁদের নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্র দেখাতে হবে? দেশের আইন তো সবার ক্ষেত্রেই এক! তাহলে বলা যেতেই পারে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভারতীয় সংবিধানকেই অবমাননা করছে।”
হরিয়ানা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ:
ধুবড়ির সাংসদ রবিকুল হোসেন জানান, “এই দেড়শো শ্রমিককে ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে হরিয়ানা প্রশাসন অকথ্য অত্যাচার চালায়।” তিনি আরও বলেন, এই শ্রমিকদের মুক্তির জন্য দলের তরফে তাঁদের দু’জনকে গুরুগ্রামে পাঠানো হয়েছিল এবং সেই খবর আগেই গুরুগ্রাম প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার প্রশাসন তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে তাঁদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়। অবশেষে, তাঁদের যুক্তির সঙ্গে পেরে না উঠে গত ২৩শে জুলাই আটক থাকা শ্রমিকদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। রবিকুল হোসেন বলেন, “কেন্দ্র এবং হরিয়ানার বিজেপি সরকার সম্ভবত সংবিধানে বর্ণিত ভারতীয়দের মৌলিক অধিকারগুলি ভুলে গিয়েছে।”
দুই সাংসদই জানিয়েছেন যে, হরিয়ানায় কাজ করতে আসা বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে যাতে কোনো অন্যায় না হয়, তার জন্য তাঁরা সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব সহ গুরুগ্রামের যুগ্ম পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র শ্রমিকদের জয় নয়, বরং ভারতীয় সাংবিধানিক অধিকার ও সম্মানের জয়। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভাষা, ধর্ম কিংবা প্রাদেশিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ভারতীয় নাগরিকের হয়রানি তাঁরা কখনও বরদাস্ত করবেন না।