খাড়গের সভা শেষের পরেই ‘শুদ্ধিকরণ’! একুশ শতকেও কি ঘুচল না জাতপাতের এই চরম লজ্জা?

একুশ শতকের আড়াই দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারতীয় সমাজে জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তার এক লজ্জাজনক ও চাঞ্চল্যকর নজির সামনে এল উত্তরাখণ্ডে। কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার কারণেই তাঁর জনসভার পর রামলীলা ময়দান গঙ্গাজল দিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’ করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গোটা দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ আগস্ট। উত্তরাখণ্ডের রামলীলা ময়দানে একটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। সভা শেষ হওয়ার ঠিক তিন দিন পর, অর্থাৎ গত বুধবার ‘শ্রীরাম সেনা ধর্মার্থ সেবা ন্যাস’-এর পক্ষ থেকে পুরো ময়দান ও সংশ্লিষ্ট মঞ্চটি গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে সাফ করা হয়। ওই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পবিত্র ধর্মীয় স্থান ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেখানে অরাজক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, তাই এই শুদ্ধিকরণ আবশ্যিক ছিল। তবে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কংগ্রেস শিবির। খোদ মল্লিকার্জুন খাড়গেও রাজ্যসভায় নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে সাফ জানিয়েছেন, দলিত পরিচয়ের কারণেই আজ তাঁদের এই চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক অপমানের শিকার হতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তরাখণ্ডের রাজনীতি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এই শুদ্ধিকরণের নেপথ্যে শাসক দল বিজেপির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত রয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি জেপি নাড্ডা এই বিতর্ক থেকে দলীয় দূরত্ব বজায় রেখে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিজেপি এই ধরনের কোনোDiscriminatory কাজকে কখনোই সমর্থন করে না এবং সমগ্র ঘটনার দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের মন্ত্রী তথা বিজেপি মুখপাত্র খজান দোস পালটা দাবি করেছেন যে, কংগ্রেস এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে অযথা রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অতীতের ছায়া ও দলিত রাজনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা ১৯৭৮ সালে দেশের তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী বাবু জগজীবন রামের সঙ্গে ঘটে যাওয়া লজ্জাজনক ঘটনার স্মৃতি উসকে দিয়েছে। সেবারও বারাণসীতে তাঁর দ্বারা একটি মূর্তির উন্মোচন হওয়ার পর উগ্রপন্থীরা সেই স্থানটি গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভারতের দলিত রাজনীতিতে এক বিরাট ঐতিহাসিক মোড় এনে দিয়েছিল। আর এবার উত্তরাখণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে রামলীলা ময়দানের এই ‘শুদ্ধিকরণ’ বিতর্ক কংগ্রেসকে নতুন করে রাজনৈতিক অক্সিজেন জোগালেও, ভারতীয় সমাজে জাতপাতের দুষ্টক্ষত যে একুশ শতকেও সমানভাবে তাজা ও কার্যকর রয়েছে, তা আরও একবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।