ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে যিনি গড়েছিলেন ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর ডাক, আজীবন আদর্শে অটল ছিলেন জেপি

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের গণতন্ত্র রক্ষা— প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তিনি হলেন লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ। রাজনীতিকে কখনোই ব্যক্তিগত ক্ষমতা দখলের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি তিনি, বরং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বিহারের সারণ জেলার সিताब দিয়ারা নামক এক সাধারণ গ্রামে জন্ম নেওয়া জেপি শৈশব থেকেই সমাজ এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অনন্য নিদর্শন রেখে গেছেন।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে ১৯২০ সালে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কলেজ জীবন ত্যাগ করে সরাসরি দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা যাওয়ার পর সেখানে চরম অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। জীবিকা নির্বাহের জন্য খেতমজুর হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে হোটেলের বাসন মাজার মতো কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। তবে হাজারো কষ্টের মাঝেও নিজের আত্মসম্মান এবং উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র সরে দাঁড়াননি তিনি।
১৯২৯ সালে দেশে ফিরে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন জেপি এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ প্রসারে ‘কংগ্রেস সোশलिस्ट পার্টি’ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে ধীরে ধীরে মোহমুক্ত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ক্ষমতার হাতবদল হলেও সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলি অপসারিত হয়নি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সমাজ সংস্কার এবং জনআন্দোলনের পথ বেছে নেন।
১৯৭৪ সালে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ফের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন তিনি। বিহারের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং ৫ জুন পাটনার ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানে ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর ডাক দেন। তাঁর এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি সমাজ ব্যবস্থার সর্বাঙ্গীণ পরিবর্তন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষটি। জরুরি অবস্থার সময় নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁর আপসহীন ভূমিকা ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
সারাজীবনে বহুবার তাঁকে লোভনীয় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পদের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি ক্ষমতা বা পদের মোহে লিপ্ত হননি। জনসেবা ও সমাজ সংস্কারই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। তাঁর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৫ সালে তাঁকে ‘রমন ম্যাগসেসে’ পুরস্কার এবং ১৯৯৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারত রত্ন’-এ ভূষিত করা হয়। ১৯৭৯ সালের ৮ অক্টোবর তাঁর জীবনাবসান ঘটলেও, তাঁর ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর স্বপ্ন এবং আদর্শ আজও ভারতীয় গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে।