তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোয় এক বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ-বিক্ষোভকে ছাপিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হলেও, রাজনৈতিক মহলের অন্দরে প্রশ্ন উঠছে—তাঁর গুরুত্ব কি তবে কমছে? বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ক্যামাক স্ট্রিট যেভাবে তৃণমূলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল, সেই জৌলুস কি এবার ফিকে হতে চলেছে?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে তৃণমূলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচি—সবই নিয়ন্ত্রিত হতো ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে। আই-প্যাক (I-PAC)-এর পরামর্শে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তগুলো দলের বহু প্রবীণ নেতার মনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংগঠন সাজাতে এবার কালীঘাটের পুরনো মডেলকেই আঁকড়ে ধরেছেন। খবর অনুযায়ী, সংগঠনে অভিষেকের প্রভাব কমিয়ে জেলা স্তরের রাশ সরাসরি মমতা-পন্থী নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসে জেলা সভাপতিদের ওপর ভরসা বেড়েছে কালীঘাটের। এখন থেকে ব্লক স্তরের নিয়োগ বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জেলা সভাপতিদের ওপরই চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। কোনো সার্ভে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং জেলা সভাপতির সুপারিশেই নির্ধারিত হবে ব্লক সংগঠনের রূপরেখা। এই পরিবর্তনের হাত ধরে মদন মিত্রকে দমদমের জেলা সভাপতি, মহুয়া মৈত্রকে নদীয়া উত্তরের দায়িত্ব এবং বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে দক্ষিণ কলকাতার সভাপতি করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তর কলকাতায় কুণাল ঘোষ, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শুভাশিস চক্রবর্তী, হাওড়া সদরে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, চুঁচুড়ায় অসিত মজুমদার, ব্যারাকপুরে অমিত গুপ্তা এবং দার্জিলিং সমতলে কুন্তল রায়কে জেলা সংগঠনের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই বদলকে তৃণমূলের প্রবীণ-নবীন দ্বৈরথের ইতিবাচক সমাপ্তি হিসেবে দেখছে শাসকদলের একাংশ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তৃণমূলের এই ‘ব্যাক টু বেসিক’ ফর্মুলা আসলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডানা ছাঁটারই নামান্তর।
এই পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিরোধীরাও। বিজেপি নেতা রাহুল সিনহার মতে, “তৃণমূল এখন চাপে পড়ে অভিষেককে আপাতত ব্যাকফুটে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ পচন এতটাই গভীর যে, এসব করে আর রক্ষা করা যাবে না।” এখন দেখার বিষয়, কালীঘাটের এই নতুন সাংগঠনিক সমীকরণ আগামী দিনের রাজনীতিতে তৃণমূলকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে, নাকি অভিষেকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার জেরে দলের অন্দরে নতুন করে বিভাজনের সৃষ্টি হয়। কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিটের এই অলিখিত লড়াইয়ের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।





