কোনো কিস্তি বাউন্স না হলেও হুড়মুড়িয়ে কমছে ক্রেডিট স্কোর? অজান্তেই এই মারাত্মক ভুলগুলো করছেন না তো?

আজকাল লাখ লাখ মানুষ এক অদ্ভুত ও অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাঁরা নিয়ম মেনে সময়ের প্রতিটা ইএমআই বা কিস্তি পরিশোধ করছেন, কোনো চেক বা কিস্তি বাউন্স হওয়ার রেকর্ড নেই—অথচ হুড়মুড়িয়ে নেমে যাচ্ছে তাঁদের বহুমূল্য ক্রেডিট স্কোর (Credit Score)। সাধারণ মানুষের মাথায় আসতেই পারে না যে, সমস্ত ঋণ সময়মতো শোধ করার পরেও কেন এমন পতন ঘটছে! আসলে ক্রেডিট স্কোর কেবল কিস্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি আপনার সার্বিক আর্থিক অভ্যাসের একটি নিখুঁত আয়না। আপনি যদি দৈনন্দিন লেনদেনে কিছু সূক্ষ্ম ভুল করতে থাকেন, তবে আপনার অজান্তেই আপনার স্কোর প্রতিদিন কমতে থাকবে। আর এর পরিণাম হিসেবে ভবিষ্যতে লোন রিজেকশন বা চড়া সুদের খাড়ার মুখে পড়তে হতে পারে আপনাকে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কোন সুপ্ত ভুলগুলো আপনার ক্রেডিট স্কোরকে ধ্বংস করছে।
প্রথমত, ক্রেডিট কার্ডের অপরিকল্পিত ও বেহায়াপূর্ণ ব্যবহার। আপনার কার্ডের লিমিট যদি ১ লক্ষ টাকা হয়, তার মানে এই নয় যে আপনি প্রতি মাসে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করে ফেলবেন। ব্যাঙ্কগুলি একে আপনার আর্থিক অসচ্ছলতা বা ‘ওভার ডিপেন্ডেন্সি’ হিসেবে গণ্য করে। নিয়ম অনুযায়ী, মোট লিমিটের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করা উচিত। যদি আপনার খরচ ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তবে ব্যাঙ্কের অ্যালগরিদমে আপনার প্রোফাইলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং আপনার স্কোর সোজা নিচে নামতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, ঘনঘন বিভিন্ন লোন বা ঋণের জন্য আবেদন করা। പല সময় মানুষ একবারে একাধিক ব্যাঙ্কে ঋণের দরখাস্ত করে বসেন, এই ভেবে যে কোথাও না কোথাও থেকে লোন পাস হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যখনই এই কাজ করেন, তখন প্রতিটি ব্যাঙ্ক আপনার ক্রেডিট রিপোর্টের ওপর একটি করে “হার্ড ইনকোয়ারি” বা কঠোর তদন্ত চালায়। এর ফলে ব্যাঙ্কগুলি ধরে নেয় যে আপনার অর্থের মারাত্মক ও আশু প্রয়োজন রয়েছে এবং আপনি গভীর আর্থিক সংকটে আছেন। এই মানসিকতা আপনার প্রোফাইলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং স্কোর তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
তৃতীয়ত, পুরনো ক্রেডিট কার্ড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা। বহু মানুষ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার কারণে তাঁদের পুরনো ক্রেডিট কার্ডটি বন্ধ করে দেন, যা একটি বিশাল বড় বোকামি। আপনার পুরনো অ্যাকাউন্টটিই আপনার ক্রেডিট হিস্ট্রিকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করে রাখে। সেটি বন্ধ করে দিলে আপনার ‘ক্রেডিট এজ’ বা দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতার বয়স কমে যায়। মনে রাখবেন, ক্রেডিট স্কোরের ৩০ শতাংশই নির্ভর করে পেমেন্ট হিস্ট্রির ওপর। পুরনো সেই ইতিহাস মুছে যাওয়ার ফলে আপনার প্রোফাইল এক নিমেষে দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া আপনার পোর্টফোলিওতে যদি শুধু পার্সোনাল লোন বা ক্রেডিট কার্ডের মতো আনসিকিউরড লোন থাকে, তবেও স্কোর মার খায়। একটি স্বাস্থ্যকর স্কোরের জন্য সিকিউরড ও আনসিকিউরড ঋণের সঠিক ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
চতুর্থত, ক্রেডিট রিপোর্টে লুকিয়ে থাকা যান্ত্রিক ও মানুষের অজান্তেই ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটি। অনেক সময় আপনার কোনো দোষ না থাকলেও টেকনিক্যাল বা সিস্টেমের ভুলের কারণে স্কোর পতন ঘটে। এমনটা হতে পারে যে অন্য কোনো ব্যক্তির ঋণ বা বকেয়ার হিসাব ভুলবশত আপনার প্যান কার্ড বা নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। কিংবা আপনার কোনো পুরনো বন্ধ হয়ে যাওয়া লোন এখনও সিস্টেমের খাতায় ‘অ্যাক্টিভ’ বা চালু দেখাচ্ছে। এই ধরনের ভুলের কারণে বিনা দোষে আপনার স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস অন্তর নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট যাচাই করা বাধ্যতামূলক। আজকাল ব্যাঙ্কগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ভিত্তিক স্কোরিং সিস্টেম ব্যবহার করে, যেখানে ছোট থেকে ছোট অবহেলাও অবিলম্বে ধরা পড়ে যায়। একটি চমৎকার ও বিশ্বস্ত আর্থিক ভবিষ্যতের জন্য ৭৫০-এর জাদুকরী গণ্ডি পার করা আবশ্যক, যার জন্য খরচ সর্বদা নিজের হাতের মুঠোয় রাখা উচিত।