কেন ফাঁকা দক্ষিণ আটলান্টিকের আকাশ? ২০০ কোটির জনসংখ্যা সত্ত্বেও কেন নেই সরাসরি বিমান?

প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ১ লক্ষেরও বেশি বিমান বিভিন্ন শহরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করলেও, বিশ্বের বিমান রুটের মানচিত্রে একটি বড় শূন্যতা সহজেই চোখে পড়ে—সেটা হল দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকাকে সরাসরি যুক্ত করা যাত্রীবাহী বিমানের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলেছে। অথচ এই দুই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি।

বিমান চলাচলের এক শতাব্দীরও বেশি ইতিহাসে একসময় দক্ষিণ আটলান্টিককে উত্তর আটলান্টিকের তুলনায় আরও কার্যকর বিমান করিডর হিসেবে বিবেচনা করা হত। ১৯২০-এর দশকেই ইউরোপ, আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মধ্যে বিমান পরিষেবা চালু হয়েছিল। এছাড়া ১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো পর্যন্ত জেপেলিন বিমানও চলাচল করত। কিন্তু বর্তমানে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যবর্তী আকাশ প্রায় ফাঁকা থাকার প্রধান কারণ প্রযুক্তিগত নয়; বরং এর পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রভাব, আয়ের কেন্দ্রীকরণ এবং সীমিত ব্যবসায়িক যোগাযোগ।

প্রথম নজরে মনে হতে পারে, দক্ষিণ আটলান্টিকের দুই তীরের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা না থাকার প্রধান কারণ ভৌগোলিক দূরত্ব। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। ব্রাজিলের নাটাল শহর থেকে সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনের দূরত্ব প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার। এই দূরত্ব যথেষ্ট হলেও এটি নিউ ইয়র্ক–লন্ডন রুটের চেয়ে অনেক কম। নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনের দূরত্ব ৫,৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি, অথচ এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বিমান রুট। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রচলিত বিমান পরিচালনা বিধি অনুযায়ী দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট যাত্রীবাহী বিমানের এমন সক্ষমতা থাকতে হয়, যাতে কোনও একটি ইঞ্জিন বিকল হলেও সর্বোচ্চ ৬০ মিনিটের মধ্যে নিকটতম বিমানবন্দরে পৌঁছানো যায়। দক্ষিণ আটলান্টিকে জরুরি অবতরণের বিকল্প বিমানবন্দরের সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় এবং অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া, সেন্ট হেলেনা ও অ্যাসেনশন দ্বীপের মতো সীমিত অবস্থানের কারণে রুট পরিচালনা বেশ জটিল হয়ে ওঠে।

আফ্রিকার জনসংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি, আর দক্ষিণ আমেরিকার জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি। অর্থাৎ, দুই মহাদেশ মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি হলেও, এর প্রধান কারণ হলো জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিমান ভ্রমণের জন্য মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের অভাব। আফ্রিকার আয়তন ৩ কোটি বর্গকিলোমিটারেরও বেশি হলেও সাহারা মরুভূমি ও কঙ্গোর ঘন অরণ্যের মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চল অত্যন্ত কম জনবসতিপূর্ণ। অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সম্মিলিত অর্থনীতির আকার বছরে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বিপরীতে দক্ষিণ আমেরিকার জিডিপি প্রায় ৪.৩ ট্রিলিয়ন এবং আফ্রিকার জিডিপি ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের কম। ফলস্বরূপ, আন্তঃমহাদেশীয় বিমানের টিকিট কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্যসম্পন্ন যাত্রীর সংখ্যা অনেক কম থাকায় বিমান সংস্থাগুলি এই রুটে বড় পরিসরে পরিষেবা চালু করতে আগ্রহী হয় না।

আফ্রিকায় হাতে গোনা কয়েকটি বড় এভিয়েশন হাব রয়েছে। এর মধ্যে জোহানেসবার্গ ও কেপ টাউন থেকে সাও পাওলোর উদ্দেশে সরাসরি বিমান পরিষেবা রয়েছে। এছাড়া ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে একটি বিমান সাও পাওলো হয়ে বুয়েনস আইরেস পর্যন্ত যায় এবং ব্রাজিলের সঙ্গে অ্যাঙ্গোলা ও কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক সম্পর্কভিত্তিক সংযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষেত্রে প্রায় সব আন্তর্জাতিক সংযোগই ব্রাজিলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, যার ফলে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যকার ট্রান্স-আটলান্টিক বিমান পরিষেবার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে সাও পাওলো।