কেন নিট কাণ্ডে এতদিন চুপ ছিলেন? অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন রাঘব চাড্ডা!

দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলে দেওয়া নিট (NEET) পরীক্ষা ও প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্ক নিয়ে এতদিন কেন মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন? অবশেষে রাজ্যসভার অধিবেশনে দাঁড়িয়ে নিজের সেই নীরবতার রহস্য ভাঙলেন প্রাক্তন আম আদমি পার্টি নেতা তথা বর্তমান বিজেপি সাংসদ রাঘব চাড্ডা। সংসদের উচ্চকক্ষে প্রশ্ন ফাঁস বিরোধী বিল নিয়ে আয়োজিত আলোচনায় সরব হয়ে ৩৭ বছর বয়সি এই রাজ্যসভা সাংসদ জানান, মিডিয়ার সামনে শুধু বক্তব্য রেখে বা ক্যামেরার সামনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের মতো গুরুতর সমস্যার সমাধান করা যায় না। তার জন্য দরকার সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান।
একসময় বিরোধী শিবিরের হয়ে গলা ফাটানো রাঘব বর্তমানে শাসকদলের সদস্য। নিজের এই পরিবর্তিত ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি প্রাক্তন দল ‘আপ’ এবং কংগ্রেসকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় রাঘব বলেন, অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কেন তিনি কোনও মন্তব্য করছেন না। তার উত্তরে সাংসদ বলেন, যখন আমি বিরোধী দলে ছিলাম, সাধারণ মানুষের সমস্যা ও ক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই ছিল আমার মূল কাজ। আর সেই কাজটা আমি পরম সততার সঙ্গে করেছি। কিন্তু এখন আমি শাসকদলের বেঞ্চে বসে আছি। ফলে আমার ভূমিকা বদলে গিয়েছে। এখন আর শুধু প্রশ্ন তোলা আমার কাজ নয়, সেই সমস্যার সঠিক ও বাস্তবমুখী সমাধান বের করাই আমার প্রধান দায়িত্ব।
তিনি আরও যোগ করেন, ক্যামেরার সামনে গিয়ে কথা বলে হেডলাইন তৈরি করা বা হাজিরা খাতা সই করার মতো কথা বলায় আমার বিশ্বাস নেই। আমি ফলে বিশ্বাস করি। আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, নিট কাণ্ড নিয়ে সংসদে আমি সেদিনই মুখ খুলব, যেদিন আমরা সিস্টেমের গলদ শুধরে এর একটা স্থায়ী সমাধান নিয়ে আসতে পারব। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন, যখন আমাদের সরকার এই ভেঙে পড়া ব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তুলছে।
আন্দোলনরত নিট পরীক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল বার্তা দেন এই তরুণ সাংসদ। তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীদের রাগ, কষ্ট ও হতাশা একশো শতাংশ ন্যায্য। কারণ একটা সাধারণ পরিবারের সন্তানের কাছে নিট পরীক্ষা কেবল একটা ডিগ্রি নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার একমাত্র পথ। এই স্বপ্নের পিছনে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কোটা বা দিল্লির মতো দূরদূরান্তে গিয়ে থাকে। সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মা-বাবা অতি কষ্টে কোচিং সেন্টারের ফি জোগান কেবল একটা আশায়।
এর পরই কেন্দ্রের মোদী সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে রাঘব বলেন, শিক্ষার্থীদের হাহাকার শুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একজন অভিভাবকের মতো এগিয়ে এসেছেন এবং পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের কথা শুনে ব্যবস্থা নেওয়ার এমন নজির বিরল। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, নিট কাণ্ডের তদন্ত অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাত্র ৭৫ দিনের মধ্যে ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে চার্জশিট পেশ করা হয়েছে, যাতে তদন্ত বছরের পর বছর আটকে না থাকে। একই সঙ্গে রাঘব এক বড় ঘোষণা করে বলেন, ভবিষ্যতে আর ওএমআর শিটে নয়, কারচুপি রুখতে নিট পরীক্ষা নেওয়া হবে সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে।
রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে বিজেপি সাংসদ জোর দিয়ে বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনাকে কোনও রাজনৈতিক দলের চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। কারণ এটি একটি ক্রনিক ব্যাধি। কোন রাজ্যে প্রশ্ন লিক হল, তখন কোন মন্ত্রী পদে ছিলেন বা কোন পার্টি ক্ষমতায় – তা না দেখে রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নীতি ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এর পরই নিজের প্রাক্তন দল আম আদমি পার্টিকে তুলোধোনা করেন রাঘব চড্ডা। গত ১৯ জুলাই পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিত ফার্মাসি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার উদাহরণ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আপ’ শাসিত পাঞ্জাবে পরীক্ষায় দেদার নকল চালানো হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের লাইভ নকল করানোর জন্য ব্লুটুথ ডিভাইস দেওয়া হয়েছিল এবং এক একটি সংগঠিত গ্যাং নাকি এক একজন পরীক্ষার্থীর থেকে ১৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে! পাঞ্জাবে আপ ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরপর একাধিক সরকারি পরীক্ষায় নয়ছয় হচ্ছে বলে তোপ দাগেন তিনি। বাদ যায়নি কংগ্রেসও। কংগ্রেস শাসিত কর্নাটকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হওয়া এসএসএলসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলে মল্লিকার্জুন খাড়্গেদের অস্বস্তি বাড়ান রাঘব। পরিশেষে, দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলকে দলমত নির্বিশেষে এই নতুন বিল সমর্থন করার আহ্বান জানান তিনি, যাতে কঠোর আইন এনে পরিশ্রমী ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা যায় এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।