কাজের শেষে জুতো খুলতেই মোজার গভীর দাগ আর ফুলে থাকা পা! এই লক্ষণকে অবহেলা করলেই বড় বিপদ?

সারাদিন অফিসে একভাবে একটানা ল্যাপটপে কাজ করা, ভিড়ভাট্টায় মেট্রো বা বাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে যাতায়াত করা, কিংবা ছুটির দিনে একটু বেশি কেনাকাটা করার পর বাড়ি ফিরে খেয়াল করেছেন কি যে পায়ের পাতাটা বেশ ভারী ভারী লাগছে? স্নিকার্স বা ফরমাল জুতোটা খুলতেই দেখা গেল গোড়ালের কাছে মোজার গাঢ় দাগ বসে গিয়েছে এবং পা সামান্য ফুলে রয়েছে। এমন দৃশ্য আমাদের অনেকের কাছেই অত্যন্ত চেনা এবং প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। সাধারণত এমনটা হলে আমরা মনে করি যে সারাদিনের ধকলের পর একটু বিশ্রাম নিলেই বা রাতে ভালো করে ঘুমোলেই সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। অধিকাংশ সময় তেমনটা ঘটেও। কিন্তু যদি দেখেন এই ফোলা ভাব আর সহজে কমতে চাইছে না? কিংবা প্রায় প্রতি বিকেলেই পা দুটো অতিরিক্ত ভারী হয়ে উঠছে?

তখন কিন্তু বিষয়টিকে শুধুমাত্র সাধারণ ‘ক্লান্তি’ ভেবে উড়িয়ে দেওয়া মস্ত বড় ভুল হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই শারীরিক অবস্থাকে বলা হয় ‘এডিমা’ (Edema)। এটি কেবল দৈনন্দিন শারীরিক খাটাখাটুনির ফল না-ও হতে পারে, বরং আপনার শরীরের ভেতরে অলক্ষ্যে দানা বাঁধা বড় কোনও মারাত্মক শারীরিক সমস্যার আগাম ও গুরুতর সংকেত হতে পারে। সহজ কথায়, আমাদের শরীরের নিম্নাংশে যখন রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে না এবং অতিরিক্ত তরল জমা হতে শুরু করে, তখনই এই ফোলা ভাব তৈরি হয়। আমেরিকার স্বাস্থ্য তথ্যসংস্থা ‘মেডলাইনপ্লাস’ (MedlinePlus) এবং বিশ্বখ্যাত ‘মায়ো ক্লিনিক’-এর গবেষণা জানাচ্ছে যে, যখন শরীর থেকে বাড়তি জল ও সোডিয়াম স্বাভাবিক নিয়মে বের হতে পারে না, তখন অভিকর্ষের টানে সেই সমস্ত তরল এসে জমা হয় পায়ের পাতা, গোড়ালি ও জঙ্ঘার টিস্যুতে।

এর পেছনে একাধিক গোপন ও জটিল শারীরিক ব্যাধি থাকতে পারে। যেমন—হৃদরোগ বা হার্ট ফেলিয়ার। হৃদযন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা যদি কমে যায়, তবে অভিকর্ষের টানে শিরায় চাপ বাড়ে এবং অতিরিক্ত তরল নিচে নেমে এসে পায়ের পাতা ও গোড়ালি ফুলিয়ে দেয়। পাশাপাশি কিডনি ও লিভারের মারাত্মক গোলযোগ এর জন্য দায়ী হতে পারে। কিডনি যখন জল ও শরীরের বর্জ্য পদার্থ সঠিকভাবে ছেঁকে বের করতে ব্যর্থ হয়, তখন শরীরে তরল জমতে শুরু করে। আর লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তে অ্যালবুমিন (Albumin) নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরি কমে যায়। এই প্রোটিন রক্তনালীর ভেতরে তরলকে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে, যার অভাবে তরল টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা অর্থাৎ ডিভিটি (Deep Vein Thrombosis) অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে, যার লক্ষণ হলো একটি পা হঠাৎ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া ও তীব্র যন্ত্রণা হওয়া।

এই সমস্যা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। একটানা এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে না থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা অন্তর অন্তত দু’মিনিট হেঁটে আসুন। বাড়িতে বিশ্রামের সময় বা রাতে ঘুমানোর সময় পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে পা সামান্য উঁচুতে রাখুন। পাতে কাঁচা লবণের ব্যবহার কমান এবং পর্যাপ্ত জল খান। তবে ফোলাভাবের সঙ্গে যদি হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বা তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হয়, তবে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।