পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মতুয়া প্রভাবিত অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং সংশয় দেখা দিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৪০টিরও বেশি বিধানসভা আসনে শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে মতুয়াদের। ২০০২ সালের পর প্রথমবার এই এসআইআর-এর অধীনে গণহারে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস, উভয় দলই তাদের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বাস্তু ঘাঁটিতে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি।
২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম নেই, তাঁদের এখন যোগ্যতার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। কিন্তু হাজার হাজার মতুয়া বহু দশক ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসায়, তাঁদের অনেকের কাছেই বৈধ কাগজপত্র নেই, যা এই উদ্বেগের মূল কারণ।
বিজেপির আশ্বাস, তবু কাটছে না সংশয়
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর, যিনি বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতুয়া মুখ, তিনি সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলেছেন, “যদি উদ্বাস্তু মতুয়াদের নাম বাদও যায়, তাতে চিন্তার কিছু নেই। তারা সিএএ-এর অধীনে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন।”
কিন্তু এই মন্তব্যেও উদ্বেগ কমছে না। শান্তনুর ভাই, বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর অনুমান করেছেন যে রাজ্যের প্রায় ৩০-৪০ লাখ উদ্বাস্তু নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের অধীনে যোগ্য হতে পারেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, “কোনও নিশ্চয়তা নেই, কারণ নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা।” তিনি আরও বলেন, সরকার সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা নাগরিকত্ব পান, অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গারা যেন প্রক্রিয়ার অপব্যবহার না করে।
তৃণমূলের তীব্র আক্রমণ: ‘বিজেপির জুমলা’
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস সুকৌশলে বলে চলেছে, এসআইআর প্রক্রিয়ার ব্যাপক প্রভাব পড়বে মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে। এটি বিজেপির ‘জুমলা’ (ভাঁওতাবাজি) এবং এর ফলে প্রচুর হিন্দুর নাম বাদ পড়বে।
তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য ২ নভেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতাদের একটি বৈঠক ডেকেছেন। তিনি পিটিআইকে বলেন, “মতুয়াদের নাম বাদ যাবে কারণ ২০০২ সালের পর যাঁরা এসেছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই নথি নেই। বিজেপির নাগরিকত্ব ‘জুমলা’ বুঝতে পেরে মতুয়ারা আমাদের ভোট দিচ্ছেন।”
তৃণমূল নেতা বিশ্বজিৎ দাস এসআইআর-কে “প্রকৃত নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি” বলে অভিহিত করে মতুয়া পরিবারগুলির কাছে পৌঁছে তাদের আশ্বস্ত করছেন যে রাজ্য তাদের অধিকার রক্ষা করবে।
ফাঁকফোকরে মতুয়াদের অনিশ্চয়তা
মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক মহিতোষ বৈদ্য কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারকেই উদ্বাস্তু হিন্দুদের “বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত করার” অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাঁরা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নেই এবং ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরেও এসেছেন, তাঁরা কী করবেন?
অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুসারে, যদি মতুয়ারা তাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে বনগাঁ এবং রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের অধীন বিধানসভা আসনগুলোর ২৫-৪০ শতাংশ ভোটার প্রভাবিত হতে পারেন।
এমনকি এই ইস্যুতে বিজেপির মধ্যেও ফাটল দেখা যাচ্ছে। বিজেপি সাংসদ অসীম সরকার সতর্ক করে বলেছেন যে দল এর ফল ভোগ করতে পারে, কারণ প্রায় ১৫ লাখ মতুয়া এবং উদ্বাস্তু মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার হারাতে পারেন।
বিজেপি এখন একটি ব্যাপক প্রচার শুরু করেছে, সীমান্ত জেলাগুলোতে ১০০০টি সিএএ ক্যাম্প পরিচালনা করছে। তাদের কৌশল হলো— এসআইআর-এর সময় নাম বাদ গেলেও, সিএএ-এর অধীনে তারা অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। তবে তৃণমূল নেতা বিশ্বজিৎ দাসের স্পষ্ট বক্তব্য, “আপনি প্রথমে কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলে অন্য আইনের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না। এটি আশ্বাস নয়, এটি অনিশ্চয়তার পুনরুৎপাদন।”