‘এখন আমাদের কী হবে?’ তারাতলায় নিহত শ্রমিকদের পরিজনের আর্তনাদ

দু’বেলা অন্নসংস্থান আর সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বুধবার সকালেও কাজে বেরিয়েছিলেন ভাটপাড়ার কৃষ্ণা চৌধুরী ও শ্যামনগরের পাপ্পু কুমার রজক। কিন্তু সেই কর্মস্থলই যে তাঁদের জন্য শেষ গন্তব্য হয়ে উঠবে, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি পরিবারের সদস্যরা। তারাতলার নির্মীয়মাণ গোডাউন বিপর্যয়ে অকালে ঝরে গেল দুটি প্রাণ, আর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল দুটি সংসারের স্বপ্ন।

কৃষ্ণার পরিবারে এখন শুধুই অন্ধকার ভাটপাড়ার বাসিন্দা কৃষ্ণা চৌধুরী গত পাঁচ মাস ধরে তারাতলার ওই সংস্থায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য ছিলেন তিনিই। অসুস্থ স্ত্রী, ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত বৃদ্ধা মা এবং তিন সন্তানকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। বুধবার সকালে পরিবারের সঙ্গে শেষ ফোনে কথা হয়েছিল তাঁর। এরপরই আসে সেই ভয়াবহ দুঃসংবাদ।

স্ত্রী সুচেতা দেবী স্বামীর মৃত্যুর কথা শুনে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “এ বার আমাদের কী হবে! সরকার সাহায্য না করলে এই পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারব না।” কৃষ্ণা চৌধুরীর বৃদ্ধা মা এবং প্রতিবেশীদের দাবি, পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কোনো একজনের চাকরির ব্যবস্থা করা হোক। বর্তমানে পরিবারের বড় মেয়েটি টিউশন পড়িয়ে সংসার চালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু অভাবের তাড়নায় ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত গোটা পরিবার।

অসহায় পাপ্পুর পরিজনেরা শ্যামনগরের বাসিন্দা পাপ্পু কুমার রজক মাত্র এক মাস আগেই ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই গোডাউনে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সোমবার সকালে কাজে বেরিয়ে বিকেলের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ আসে। পাপ্পুর শোকাতুর আত্মীয় অশোক রজক বলেন, “আমরা জানতে চাই, ঠিক কার গাফিলতিতে এই মৃত্যু হলো? সরকার যেমন আমাদের পাশে দাঁড়াক, তেমনই এই ঘটনার সঠিক তদন্তও হোক।”

শোকের ছায়া ও সরকারের ভূমিকা তারাতলা বিপর্যয়ে উদ্ধারকার্যে ছয়টি দপ্তরের সমন্বয়ে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হলেও, কৃষ্ণা ও পাপ্পুর মতো শ্রমিকদের জীবনের চাকা থমকে গেল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই মৃতদের পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন। তবে এই অর্থ সাহায্যের পাশাপাশি, মৃতদের পরিবারের সদস্যরা এখন সরকারের কাছ থেকে ভবিষ্যতের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা চাইছেন।

শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই শ্রমিকের মৃত্যু কেবল দুটি পরিবারের বিনাশ নয়, বরং নির্মাণ শিল্পের নিরাপত্তা নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নও বটে। তদন্ত এখন কোন পথে এগোয় এবং এই অসহায় পরিবারগুলি কতটা সরকারি সহায়তা পায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।