শুক্রবার দেশজুড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আবারও ভারতের জ্বালানি অর্থনীতির এক বৈচিত্র্যময় এবং কিছুটা বিতর্কিত বাস্তবতাকে সামনে এনে দিল। বর্তমানে আপনি দেশের কোন প্রান্তে বাস করছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আপনার যাতায়াতের খরচ কতটা হবে। ১৫ মে, ২০২৬-এর নতুন হিসেব অনুযায়ী, রাজধানী দিল্লিতে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৯৭.৭৭ টাকা হলেও, তিলোত্তমা কলকাতায় সেই দাম পৌঁছেছে ১০৮.৭৪ টাকায়। অর্থাৎ, একই এক লিটার তেলের জন্য শহরভেদে ফারাক হয়ে যাচ্ছে প্রায় ১১ টাকা!
কেন এই আকাশ-পাতাল পার্থক্য?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, তেল যখন এক, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি যখন এক, তবে দাম কেন আলাদা? এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে ‘ট্যাক্স’ বা করের জটায়। পেট্রোল ও ডিজেল এখনও জিএসটি-র (GST) আওতাভুক্ত নয়। জ্বালানির দামের মধ্যে কয়েকটি স্তর থাকে—মূল দাম, পরিবহণ খরচ, ডিলার কমিশন এবং কেন্দ্রের আবগারি শুল্ক। এরপরই যুক্ত হয় প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব ‘ভ্যাট’ (VAT) বা বিক্রয় কর। পশ্চিমবঙ্গ বা মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলি যে হারে ভ্যাট ধার্য করে, দিল্লি বা উত্তরপ্রদেশের কর কাঠামো তার চেয়ে অনেক হালকা। ফলে করের বোঝাই মূলত কলকাতার তেলকে দিল্লির চেয়ে মহার্ঘ করে তোলে।
পরিবহণ না কি সেস—দায়ী কে?
তেল শোধনাগার থেকে ডিপো হয়ে পাম্পে পৌঁছতে পরিবহণ খরচ বা ফ্রেট চার্জ কিছুটা প্রভাব ফেলে ঠিকই, তবে তা করের মতো এত বড় ফারাক তৈরি করে না। উদাহরণস্বরূপ, সমুদ্রতীরবর্তী শহর হওয়া সত্ত্বেও মুম্বইয়ে পেট্রোলের দাম ১০৬.৬৮ টাকা, যা দিল্লির চেয়ে অনেক বেশি। এর কারণও সেই স্থানীয় সেস এবং সারচার্জ। করের এই গোলকধাঁধায় পোর্ট ব্লেয়ারের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক সময় মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কম দামে তেল মিলতে দেখা যায়।
বিশ্ব বাজারের প্রভাব ও সরকারি অবস্থান:
আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০২ ডলারে ঘোরাফেরা করছে। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনায় ‘হরমুজ প্রণালী’র সরবরাহ পথ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাই এই মূল্যবৃদ্ধির অনুঘটক। ভারত তার চাহিদার ৮০ শতাংশ তেল আমদানি করে, তাই আন্তর্জাতিক ওঠানামা সরাসরি আমাদের পকেটে প্রভাব ফেলে।
তবে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সিআইআই (CII) সামিটে আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। তাঁর দাবি, ২০২২ সাল থেকে অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতে দাম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশের শোধনাগারগুলি বর্তমানে পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে। তবুও, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এক দেশে তেলের দামের এই বিপুল বৈষম্য কবে দূর হবে?





