এক জমিতে দুই ফসলের ম্যাজিক! উত্তরপ্রদেশের এই গ্র্যাজুয়েট গৃহবধূর তাক লাগানো চাষে ঘুরল ভাগ্যের চাকা!

ইচ্ছা থাকলে এবং সঠিক কৌশল জানা থাকলে যে ছোট জমি থেকেই অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব, তার এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উত্তরপ্রদেশের গোন্ডা জেলার ঝানঝারি উন্নয়ন ব্লকের এক প্রগতিশীল নারী কৃষক নেলসা। প্রচলিত গতানুগতিক চাষাবাদের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে তিনি একই জমিতে আন্তঃফসল বা মিশ্র চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করে বর্তমানে প্রচুর আর্থিক মুনাফা অর্জন করছেন। তিনি মূলত মাচা পদ্ধতিতে করলা চাষের পাশাপাশি মাটির নিচে মিষ্টি আলু বা কচু চাষ শুরু করেছেন, যার ফলে তিনি একই জমি থেকে যুগপৎ দুটি ফসলের সর্বোচ্চ সুবিধা উপভোগ করছেন। তাঁর এই আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত আয়কেই বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়নি, বরং আশেপাশের এলাকার অন্যান্য কৃষকদের মধ্যেও নতুন এক আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লোকাল ১৮-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রগতিশীল নারী কৃষক নেলসা জানান যে তিনি পড়াশোনা শেষ করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এরপর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি পুরোপুরি একজন গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলাতে শুরু করেন। তবে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি এবং নিজের একটি স্বাধীন পরিচয় গড়ে তোলার তাগিদে তিনি ঘরে বসে না থেকে কৃষিকাজকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে তিনি সম্পূর্ণ প্রচলিত এবং পুরোনো পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতেন, যার ফলে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও লাভের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু ক্রমবর্ধমান কৃষিকাজের খরচ এবং সেই তুলনায় কম আয়ের ফলে তিনি গভীরভাবে হতাশ না হয়ে কিছু একটা নতুন ও লাভজনক উপায় খোঁজার চেষ্টা করেন।
ঠিক সেই সময়ে কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াটার ইনস্টিটিউটের কতিপয় অভিজ্ঞ গবেষক তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে মাচা পদ্ধতিতে আধুনিক সবজি চাষের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেন। তাঁরা বোঝান যে মাচার ওপরে লতজাতীয় সবজি চাষ করলে জমির ওপরের অংশের সঠিক ব্যবহার হয় এবং নিচের ফাঁকা মাটিতে অনায়াসে অন্য ফসল ফলানো সম্ভব। তাঁদের এই অমূল্য পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে নেলসা এক বিঘা জমিতে অভিনব উপায়ে করলা ও মিষ্টি আলু বা কচুর মিশ্র চাষ শুরু করেন। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে মাচার ওপর করলা চাষ করেন, যা খুব দ্রুত পেকে বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে, অন্যদিকে মাটির নিচে মিষ্টি আলু বা কচু চাষ করেন যার বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে ধীরগতির হয়।
এই মিশ্র চাষ পদ্ধতির মূল সুবিধা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নেলসা জানান যে, করলা খুব কম সময়ে বাজারে বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়া যায়, আর মিষ্টি আলু বা কচু কিছুটা দেরিতে তোলা হয়। এর ফলে পুরো কৃষি মরশুম জুড়েই তাঁর ঘরে নিয়মিত আয়ের একটি স্থায়ী উৎস বজায় থাকে। একই জমিতে দুটি ভিন্ন প্রকৃতির ফসল চাষ করার কারণে জমির উর্বরতা শক্তির সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হয় এবং আলাদা করে সার ও সেচের আনুষঙ্গিক খরচ অনেকটাই কমে যায়। নেলসা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে করলার লতাগুলো মাচার ওপর ডালপালা বিস্তার করে বড় হয়, আর মিষ্টি আলু মাটির গভীরে বা নিচে বৃদ্ধি পায়। ফলে এই দুটি ফসল কোনোভাবেই একে অপরের বৃদ্ধিতে বা পুষ্টি সংগ্রহে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না, বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
খরচ এবং লাভের হিসাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান যে, এই বিশেষ পদ্ধতিতে এক বিঘা জমিতে চাষ করতে মাত্র ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মতো সামান্য খরচ হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে করলা এবং মিষ্টি আলু উভয়েরই ব্যাপক চাহিদা থাকায় সঠিক সময়ে ভালো ফলন পেলে বেশ মোটা অঙ্কের লাভ ঘরে তোলা সম্ভব হয়। সফল এই নারী কৃষক জানান যে, নিয়মিত ও সঠিক পরিচর্যা, সময়মতো পরিমিত সেচ এবং সুষম জৈব সারের সঠিক ব্যবহারই যেকোনো ফসলের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে পারে। তাঁর এই অনুকরণীয় সাফল্য আজ উত্তরপ্রদেশের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশের নারী শক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে।