একতলা সমান জলে ডুবল আসানসোল! লাগাতার বৃষ্টি ও নদীর জলোচ্ছ্বাসে চরম বিপাকে বাসিন্দারা!

টানা ও মুষলধারে বৃষ্টির জেরে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প শহর আসানসোলের বুক চিরে বয়ে চলা গাঁড়ুই নদীর জলস্তর হঠাৎ করেই বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আসানসোলের রেলপাড়-সহ বিস্তীর্ণ জনবহুল এলাকা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আকস্মিক এই বন্যায় বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু মানুষকে উদ্ধার করে স্থানীয় ধর্মশালা, স্কুল ও ধর্মীয় স্থানগুলোতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও, এখনও বহু মানুষ জলের মধ্যে নিজেদের বাড়ির ছাদে বন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে, ত্রাণের বন্টন ও উদ্ধারকাজে নেমেও স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে জনপ্রতিনিধিদের, কারণ দুর্গতদের অভিযোগ—এই বিপদের দিনেও অনেকে সময়মতো খোঁজ নিতে আসেননি।
সোমবার সকাল থেকেই আসানসোলে একনাগাড়ে বৃষ্টি চলতে থাকায় গাঁড়ুই নদীর জলস্তর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। দুপুরের পরেই নদীর জল বিপসীমা অতিক্রম করে যায়। কিন্তু বৃষ্টির তীব্রতা না কমায় রাতের অন্ধকার নামতেই নদীর বাঁধ উপচে সেই জল সরাসরি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে। বিশেষ করে আসানসোলের রেলপাড় এলাকায় প্রবল বেগে জল ঢুকতে থাকায় পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলের উচ্চতা এতটা বৃদ্ধি পায় যে আসানসোলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় একতলা সমান জলের নিচে তলিয়ে যায়। আকস্মিক এই জলস্ফীতিতে ঘরবাড়ির আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় বহু জিনিসপত্র সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। প্রাণভয়ে আতঙ্কিত বাসিন্দারা শেষ রক্ষা হিসেবে নিজেদের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলা প্রশাসন ও পুরনিগমের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কিছু পরিবারকে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন উঁচু স্থান, ধর্মশালা এবং স্কুল ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়েছে এবং সেখানে তাঁদের জন্য প্রাথমিক ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে দুর্গতদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, উদ্ধারকারী দল সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় শত শত মানুষ এখনও বাড়ির ছাদে বন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। উত্তর আসানসোলের চারটি ওয়ার্ড পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে পড়ায় সেখানে পৌঁছানোর সমস্ত রাস্তাঘাট জলের নিচে তলিয়ে গেছে এবং বেশ কয়েকটি সেতু ভেসে যাওয়ার কারণে ওই এলাকাগুলো বাকি শহর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও কিছু এলাকায় প্রাক্তন কাউন্সিলর ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বুক সমান জলে হেঁটে দুর্গতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ, পাউরুটি এবং প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেওয়ার মানবিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাক্তন কাউন্সিলর গৌরব গুপ্ত ইটিভি ভারতকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তিনি গত রাত থেকেই সাধারণ মানুষের পাশে ময়দানে রয়েছেন। অনেক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছাদের ওপর আটকে থাকা মানুষদের মধ্যে শুকনো খাবার ও শিশুদের জন্য জরুরি সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, যেভাবে জলস্তর হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, তাই তিনি বাসিন্দাদের কিছুটা ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে, যেকোনো বড় ধরনের শর্ট সার্কিট বা দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো রেলপাড় এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে জলমগ্ন ঘরে থাকতে বাধ্য হওয়ায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বহু গুণে বেড়ে গিয়েছে। এর পাশাপাশি জমা জলে মশার উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করার ফলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ ও উদ্ধারকার্য চালানোর চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ কোনোভাবেই থামছে না। দুর্গতদের স্পষ্ট অভিযোগ, ভোটের সময় নেতা-মন্ত্রীদের গলিতে গলিতে দেখা গেলেও আজ যখন তাঁরা সর্বস্বান্ত, তখন কাউকে পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেছেন যে, প্রতিবছর বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই গাঁড়ুই নদীর জল উপচে এই একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীর দুই তীরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ নির্মাণ এবং দীর্ঘদিন ধরে নদী সংস্কার না হওয়ায় পলি জমে নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা কমে গিয়েছে। এর আগে আসানসোল পুরনিগম গাঁড়ুই নদী সংস্কারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান তৈরি করলেও সেই কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ায় আজ এই ভয়াবহ প্লাবনের মুখে পড়তে হয়েছে আসানসোলবাসীকে। পুরনিগমের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন যে, বিপর্যয় মোকাবিলা দল, পুলিশ ও দমকল বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার এবং দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ জোরকদমে চলছে।