“উপগ্রহ ধ্বংস করতেই ভয়ে বুক কেঁপেছিল আমেরিকার!”-‘মিশন শক্তি’তে ঠিক কী হয়েছিল?

২০১৯ সালের মার্চ মাস। ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। ‘মিশন শক্তি’ (Mission Shakti)-র সফল অ্যান্টি-স্যাটেলাইট (A-SAT) ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ভারত। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে নিজের দেশেরই একটি নিষ্ক্রিয় উপগ্রহকে মহাকাশে নিখুঁত নিশানায় ধ্বংস করে ভারত প্রমাণ করেছিল যে, স্পেস টেকনোলজিতেও সে এখন বিশ্বমানের পরাশক্তি। আমেরিকা, রাশিয়া এবং চিনের পর চতুর্থ দেশ হিসেবে এই ঐতিহাসিক কীর্তি গড়েছিল ভারত। তবে এই ঘটনার পরই মার্কিন গোয়েন্দা মহলে যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এতদিন ছিল অন্তরালে।
মার্কিন গোয়েন্দার পডকাস্টে বিস্ফোরক তথ্য
সম্প্রতি প্রাক্তন মার্কিন বায়ুসেনা গোয়েন্দা আধিকারিক ডেভিড গ্রুশ এক পডকাস্টে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনের চাঞ্চল্যকর বিবরণ প্রকাশ্যে এনেছেন। তিনি জানান, ‘মিশন শক্তি’-র সফল পরীক্ষার খবর সামনে আসতেই তৎকালীন সময়ে ন্যাশনাল রিকনেসাঁস অফিস বা NRO-তে কর্মরত মার্কিন গোয়েন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও শোরগোল শুরু হয়ে গিয়েছিল।
তবে ভারতের এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা সাফল্য আমেরিকার চিন্তার আসল কারণ ছিল না। মার্কিন বিজ্ঞানীদের ভয়ের মূল কারণ ছিল মহাকাশের আবর্জনা বা ‘স্পেস ডেব্রিস’ (Space Debris)। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, উপগ্রহ ধ্বংসের ফলে মহাশূন্যে যে হাজার হাজার ধাতব টুকরো বা খণ্ডবিখণ্ড অংশ ছিটকে বেরিয়েছে, তা অন্য কোনো দেশের বহুমূল্য উপগ্রহে গিয়ে আছড়ে পড়তে পারে এবং তাতে মহাকাশ বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ভারতের সুচিন্তিত কৌশল ও সাফাই
যদিও আন্তর্জাতিক মহলের এই আশঙ্কার বিপরীতে ভারতের বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। যে মাইক্রোস্যাট-আর (Microsat-R) উপগ্রহটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তা স্থাপন করা হয়েছিল অত্যন্ত কম উচ্চতায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে পরীক্ষার পর তৈরি হওয়া মহাকাশীয় ধ্বংসাবশেষ দ্রুত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ঘর্ষণেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং কক্ষপথে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ঝুঁকি তৈরি না হয়।
তা সত্ত্বেও মার্কিন ট্র্যাকাররা সেই সময় শতাধিক ছোট-বড় ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করেছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মহাকাশ নিরাপত্তা এবং স্পেস ডেব্রিস নিয়ে নতুন করে জোরদার বিতর্ক শুরু হয়।
শুরু থেকেই নিজেদের অবস্থানের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও অনড় ছিল ভারত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ‘মিশন শক্তি’ কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নয়; বরং দেশের নিজস্ব মহাকাশ সম্পদ ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধির এক আত্মরক্ষামূলক প্রয়াস মাত্র। তা সত্ত্বেও ভারতের এই মহাকাশ জয় যে মহাশূন্যের ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার মতো পরাশক্তিগুলির মানসিকতা ও কৌশলগত সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছিল, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।