আর জি কর কাণ্ডে অভিযুক্তের ছেলেকে টিকিট! তৃণমূলের ‘আশীর্বাদ’ কি তবে নির্মল-বাহিনীর ওপর?

আর জি কর কাণ্ডের ছায়া আজও বাংলার রাজনীতিতে এক দগদগে ক্ষতের মতো বিরাজ করছে। এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নান্টু ঘোষ ওরফে নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ভয়াবহতা নিয়ে গত দু’বছর ধরে সরব হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজ। পানিহাটির মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন, কীভাবে তৃণমূল কংগ্রেস এবং তৎকালীন রাজ্য সরকারের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে গড়ে উঠেছিল নির্মল ঘোষের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শাসকদলের আশীর্বাদ ও সমর্থন ছিল প্রশ্নাতীত।
আজকের রাজনৈতিক সমীকরণে দুটো ছবি যেন একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত। একদিকে, আর জি করের অভয়ার শোকস্তব্ধ বাবা-মা শিয়ালদহ কোর্টে দাঁড়িয়ে অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে এবং নির্মল ঘোষের গ্রেফতারির আর্জি জানিয়ে চোখের জল ফেলছেন। অন্যদিকে, একই শাসকদল তৃনমূল কংগ্রেস তাদের ‘প্রভাবশালী’ নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করার জন্য দলীয় টিকিট ধরিয়ে দিয়েছে। কেবল টিকিট দেওয়াই নয়, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিশেষ নজর রয়েছে এই প্রার্থীর ওপর।
স্বয়ং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে সৌভাগ্যবান তৃণমূল নেতাদের কেন্দ্রে গিয়ে জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন, সেই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন এই তীর্থঙ্কর ঘোষ। আর জি কর কাণ্ডের পরবর্তী সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে প্রচুর বিতর্ক হয়েছিল। আজ নির্মল ঘোষের ছেলেকে প্রার্থী করে কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিট কি পরোক্ষভাবে বার্তা দিয়ে দিল না যে, আর জি কর কাণ্ডে নির্মল-বাহিনীর ভূমিকা—অভয়ার দেহ দ্রুত পুড়িয়ে দেওয়া, ঘটনার পর দুই দিন ধরে বাড়ি ঘিরে রেখে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টা—এই সবকিছুর নেপথ্যে ছিল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নীরব সম্মতি?
এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। আর জি কর কাণ্ডে তৎকালীন শাসকদলের ভূমিকা নিয়ে জনমানসে যে ক্ষোভ ছিল, তীর্থঙ্কর ঘোষের এই মনোনয়ন সেই ক্ষতকে যেন আরও তাজা করে তুলল। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, অভয়ার ন্যায়বিচারের কথা বললে যে দল মুখে কুলুপ আঁটে, তারা কীভাবে অভিযুক্তের পরিবারকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়? সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশও এই মনোনয়নকে নৈতিকতার চরম অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, পানিহাটির মানুষ কি প্রদীপ্তকে সমর্থন জানাবেন নাকি শাসকদলের এই ‘নির্লজ্জ’ রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিবাদ করবেন? অভয়ার বাবা-মা যখন বিচারের আশায় আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তখন অভিযুক্তের পরিবারের এই রাজনৈতিক উত্থান কি তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিকেই উন্মোচিত করছে না? ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন কেবল ভোট নয়, এটি হবে বাংলার বিবেক ও ন্যায়বিচারের এক অগ্নিপরীক্ষা। শাসকদলের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ইভিএম মেশিনে কতটা পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।