‘আয়নাঘর’-এর ভয়ে চরম ঝুঁকি! সাংবাদিক কীভাবে হাসিনাকে সরানোর মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছিলেন?

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই কি নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসকে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাটকীয় বিদায় ঘিরে সামনে এল এমনই এক বিস্ফোরক তথ্য।
আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ইউনুসের যোগাযোগের মূল ‘মিডলম্যান’ বা মধ্যস্থতাকারী ছিলেন ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র (AFP) এক সাংবাদিক! সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর গোপন তথ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে এনেছেন এএফপি-র ঢাকার তৎকালীন ব্যুরো প্রধান শফিকুল আলম, যিনি বর্তমানে মুহাম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এক গজ দূরের গোপন ছক ও চরম ঝুঁকি!
২৮ অক্টোবর একটি আবেগঘন ও বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টে শফিকুল আলম জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ছাত্রনেতাদের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর দায়িত্ব পালন করেন এএফপি-র ঢাকা ফ্যাক্ট চেক দলের সম্পাদক কাদারউদ্দিন শিশির।
শফিকুল আলমের দাবি অনুযায়ী:
অফিস কক্ষে তাঁর মাত্র এক গজ দূরত্বে বসেই সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে ইউনুসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন শিশির।
ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই প্রথম প্যারিসে থাকা মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা ও যোগসূত্রের ব্যবস্থা করেন।
সেই সময় পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শেখ হাসিনা বা তাঁর গোয়েন্দা সংস্থা যদি এই পরিকল্পনার সামান্যতম আঁচ পেত, তবে শিশির সহ এএফপি-র পুরো টিমকে নির্মম ‘আয়নাঘরে’ গুম করে দেওয়া হতো।
[ ২০২৪-এর ক্ষমতা পরিবর্তনের টাইমলাইন ]
জুলাই-আগস্ট : কোটা আন্দোলন থেকে একদফা সরকার পতনের ডাক
গোপন যোগাযোগ : এএফপি সাংবাদিকের মাধ্যমে ইউনুস-ছাত্রনেতা বৈঠক
৫ আগস্ট : শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে আশ্রয়
৬ আগস্ট : অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে ইউনুসের নাম ঘোষণা
৮ আগস্ট : প্যারিস থেকে ঢাকায় ফিরে শপথ গ্রহণ
হঠাৎ ঘটেনি, ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা!
এতদিন পর্যন্ত ২০২৪ সালের গণবিক্ষোভকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হলেও, এই নতুন তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন— তবে কি এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত সরকার পরিবর্তনের ছক ছিল?
ইতোপূর্বেও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা এবং কিছু চরমপন্থী ইসলামপন্থী গোষ্ঠীরও ভূমিকা ছিল এই অভ্যুত্থানে। এমনকি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুহাম্মদ ইউনুস নিজেও স্বীকার করেছিলেন, “এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত একটি ঘটনা। হঠাৎ করে কিছু ঘটেনি। এর নেতৃত্বের ধরনও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে মূল চালিকাশক্তিকে গ্রেপ্তার করা না যায়।”
পুরস্কার ও কূটনৈতিক মোড়: উল্লেখযোগ্যভাবে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় বিশ্বজুড়ে হাসিনার পতন ও শেখ হাসিনার দেশছাড়ার আগাম খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘সোসাইটি অফ পাবলিশার্স ইন এশিয়া’ (SOPA) পুরস্কারে ভূষিত হন শফিকুল আলম।
ডিসেম্বরেই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা?
এএফপি-র এই বিস্ফোরক তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার তীব্র ইঙ্গিত দিয়েছেন। এক অনলাইন বার্তায় দৃঢ়কণ্ঠে হাসিনা জানিয়েছিলেন, “আমি ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরব। মৃত্যুর ভয় বা গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে আমাকে থামানো যাবে না।”
তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বর্তমান ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদদের সেই ঐতিহাসিক সুপারিশ এবং এএফপি সাংবাদিকের গোপন মধ্যস্থতার গল্প সামনে আসায় এখন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জল কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে চর্চা তুঙ্গে।