আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের পরেই বড় চমক! এবার কি তবে সত্যি সত্যিই সব বিতর্কের অবসান ঘটালেন লিওনেল মেসি?

আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর মাত্র কয়েক দিন পার হতে না হতেই বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে ফের একবার শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা ও আলোচনার ঝড়। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি চোখধাঁধাঁনো ব্র্যান্ডেড ভিডিও পোস্ট করেছেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকরী তারকা। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড মিশেলব আল্ট্রার নতুন বিজ্ঞাপন প্রচার অভিযান ‘ট্যাব ক্লোজড’-এর অংশ হিসেবে প্রকাশিত এই বিশেষ ভিডিওটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে। এই বিজ্ঞাপনের মূল আকর্ষণ ছিল একটি লম্বা রসিদ বা বিল, যার মাধ্যমে কার্যত দীর্ঘদিনের চর্চিত ‘গোট’ বা সর্বকালের সেরা ফুটবলার সংক্রান্ত বিতর্কের এক প্রকার ইতি টানা হয়েছে।

বিজ্ঞাপনের একেবারে শুরুতেই অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দেখা যায় যে, এক পেশাদার বারটেন্ডার একটি ক্যাশ বিল বা ট্যাব বন্ধ করার সমস্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সাধারণ কোনো রেস্তোরাঁর খাবার বা পানীয়ের বিলের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। বরং একটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর রসিদের মাধ্যমে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে খোদ আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির বর্ণময়, গৌরবোজ্জ্বল ও রেকর্ডভাঙা আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের অগণিত সাফল্য ও নানাবিধ পরিসংখ্যান।

ওই বিশেষ রসিদে একে একে উল্লেখ করা হয়েছে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে মেসির খেলা মোট ২০৭টি ম্যাচ এবং তাঁর করা চোখধাঁধাঁনো ১২৫টি গোলের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে তাঁর বর্ণময় কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ খেতাব জয়ের স্মরণীয় মুহূর্তগুলিও—যার মধ্যে অন্যতম হল কোপা আমেরিকা ২০২১, বহু প্রতীক্ষিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২ এবং কোপা আমেরিকা ২০২৪-এর মুকুট জয়।

বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চেও মেসির অসাধারণ ও অপ্রতিরোধ্য রেকর্ডকে একেবারে আলাদাভাবে হাইলাইট করা হয়েছে এই বিজ্ঞাপনে। প্রকাশিত সেই রসিদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে বিশ্বকাপে মেসির ২১টি গোল, ২৩টি মেগা জয় এবং ৯৯টি চোখজুড়ানো অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য হিসেব। এমনকি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে টানা ছ’টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুদীর্ঘ যাত্রা এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত মাইলফলকও এই বিজ্ঞাপনের ফ্রেমে খুব সুন্দরভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

তবে এখানেই শেষ নয়, কেবল ঠান্ডা পরিসংখ্যান নয়, বরং ফুটবল মাঠে মেসির সুদূরপ্রসারী জাদুকরী প্রভাবকেও অত্যন্ত সৃজনশীল উপায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওই রসিদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে রেকর্ড ভাঙার অদম্য জেদ, সাধারণ মানুষের সমস্ত প্রত্যাশার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করার ক্ষমতা এবং গোটা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে অনুপ্রাণিত করার মতো বিরল সব অর্জনের কথা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় মেক্সিকোর বিরুদ্ধে মেসির করা সেই বিশ্বখ্যাত জাদুকরী গোলের কথা অত্যন্ত আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল রসিদের একেবারে নিচের অংশে। সেখানে বড় বড় অক্ষরে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখে দেওয়া হয়েছে, “G.O.A.T. Debate Settled.” অর্থাৎ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বনাম লিওনেল মেসিকে ঘিরে ফুটবল দুনিয়ায় যে চিরকালীন ‘সর্বকালের সেরা কে’ এই বিতর্ক দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছিল, তার অবসান ঘটেছে এবং এই বিতর্কের চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, মেসির সঙ্গে এই তীব্র ‘গোট’ বিতর্কে বিগত দেড় দশক ধরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে আরেক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নাম। বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে এল ক্লাসিকোর লড়াইয়ে নামার সময় লা লিগার সেই সোনালী দিনগুলি ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। পরবর্তীকালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবুজ হাসপাতালেও বহুবার মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন এই দুই কিংবদন্তি।

ক্লাব ফুটবল এবং জাতীয় দলের হয়ে কেরিয়ারের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মেসি ও রোনাল্ডো সব মিলিয়ে মোট ৩৬ বার একে অপরের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এই সমস্ত হাই-ভোল্টেজ দ্বৈরথের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, এর মধ্যে মেসির দল জয়লাভ করেছে মোট ১৬টি ম্যাচে, রোনাল্ডোর দল জিতেছে ১১টি ম্যাচে এবং বাকি ৯টি ম্যাচ অমীমাংসিত বা ড্র হিসেবে শেষ হয়েছে। এই পারস্পরিক মুখোমুখি লড়াইগুলোতে লিওনেল মেসির ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা ২২টি, যেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো করেছেন ২১টি গোল।

অবশ্য আন্তর্জাতিক ফুটবলের সামগ্রিক পরিসংখ্যান এবং গোল ও ম্যাচ সংখ্যায় সামান্য হলেও কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর মোট আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা ১৪৬টি, যেখানে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির গোল সংখ্যা ১২৫টি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মোট appearances বা উপস্থিতির নিরিখেও রোনাল্ডোর সংখ্যা অনেকটাই বেশি—২৩৩টি ম্যাচে খেলেছেন তিনি, তুলনায় মেসির ম্যাচ সংখ্যা ২০৭।

অন্যদিকে, ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ট্রফি সংখ্যায় রোনাল্ডো এগিয়ে থাকলেও, তাঁর সুদীর্ঘ বর্ণময় ক্যারিয়ারে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে লোভনীয় ট্রফি—ফিফা বিশ্বকাপ জয় অধরাই থেকে গেছে। অথচ লিওনেল মেসি ২০২২ সালে একক নৈপুণ্যে ও অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে সেই আক্ষেপ চিরতরে মিটিয়েছেন। পক্ষান্তরে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নিজের ফুটবল জীবনে টানা ছ’টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও একবারও বিশ্বমঞ্চের সোনার ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেননি।

আর ঠিক এই জায়গাতেই মিশেলব আল্ট্রার এই নতুন এবং অভিনব বিজ্ঞাপনটি ফুটবল প্রেমীদের মনে আরও একবার উসকে দিয়েছে সেই বহু পুরোনো, বিতর্কিত ও লাখ টাকার প্রশ্ন—ফুটবলের নিখাদ সর্বকালের সেরা আসলে কে? যদিও এই বিশ্বজুড়ে চলা জল্পনা-কল্পনার মাঝেই মিশেলব আল্ট্রার এই বিজ্ঞাপনী প্রচারের মূল বার্তাটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করে দিয়েছে যে, সমস্ত বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ফুটবলের অবিসংবাদিত ‘গোট’ হলেন একমাত্র লিওনেল মেসিই।