অ্যান্টার্কটিকার বরফের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে টাটকা রক্ত? জানুন পৃথিবীর রহস্যময় ‘ব্লাড ফলস’-এর আসল সত্যি!

পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত, নিস্তব্ধ এবং হাড়কাঁপানো ঠান্ডার দেশ অ্যান্টার্কটিকা। মাইলের পর মাইল সাদা বরফের চাদর আর নীল হিমবাহের এই দেশে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত বিস্ময়—”ব্লাড ফলস” বা রক্তের জলপ্রপাত। প্রথম দর্শনে যে কারোরই মনে হতে পারে, বিশাল হিমবাহ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে টাটকা রক্ত। বরফের বুক চিরে লাল জলধারা গড়িয়ে পড়ছে নিচে। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছিল এক অলৌকিক রহস্য।

পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার “ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিজ” (McMurdo Dry Valleys)-এর বুকে অবস্থিত এই জলপ্রপাত। এই উপত্যকাটিকে বলা হয় পৃথিবীর ‘মঙ্গল গ্রহ’, কারণ এখানে গত ২০ লক্ষ বছরে বৃষ্টির দেখা মেলেনি। এখানেই রয়েছে বিশাল “টেলর হিমবাহ” (Taylor Glacier)। এই হিমবাহের শেষ প্রান্তে যেখানে বরফ লেক বনির (Lake Bonney) সাথে মিশেছে, সেখান থেকেই ফোঁটা ফোঁটা করে বেরিয়ে আসে এই লাল জল। ১৯১১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ভূতত্ত্ববিদ থমাস গ্রিফিথ টেলর প্রথম এটি আবিষ্কার করেন। জায়গাটি এতটাই দুর্গম যে সাধারণ পর্যটকদের জন্য এখানে যাওয়া নিষিদ্ধ, শুধুমাত্র বিশেষ হেলিকপ্টারের মাধ্যমেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব।

দীর্ঘ এক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—জলের রং লাল কেন? শুরুতে শৈবালকে দায়ী করা হলেও ২০১৭ সালে নাসা (NASA) এবং আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা রাডার ও কেমিক্যাল বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসল জট খোলেন। জানা যায়, এই জল আসলে প্রায় ১৫ লক্ষ বছর ধরে হিমবাহের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক অতি লবণাক্ত লেকের জল। হিমবাহের প্রায় ৪০ মিটার নিচে এই লেকটি সম্পূর্ণ অক্সিজেনহীন অবস্থায় ছিল। এই জলে সমুদ্রের জলের তুলনায় তিন গুণ বেশি লবণ এবং প্রচুর পরিমাণে আয়রন বা লোহা জমা হয়েছিল। হিমবাহের সরু ফাটল দিয়ে যখন এই ঘন ও লবণাক্ত জল বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন আয়রন অক্সিডাইজ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই রাসায়নিক বিক্রিয়াতেই সাদা বরফের ওপর তৈরি হয় লালচে-কমলা রঙের উজ্জ্বল ধারা—যা দেখতে অনেকটা পুরনো লোহার পাইপ থেকে বের হওয়া মরচে ধরা জলের মতো।

কিন্তু এই জলপ্রপাতটি শুধু বৈজ্ঞানিক বিস্ময় নয়, এটি এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গবেষণার কেন্দ্র। বিজ্ঞানীরা এই জলপ্রপাতে এমন এক ধরনের অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পেয়েছেন, যাদের বেঁচে থাকার জন্য আলো বা অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না। তারা মূলত লোহা ও সালফার থেকে শক্তি সংগ্রহ করে টিকে থাকে। নাসা-র গবেষকরা মনে করছেন, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা বা মঙ্গল গ্রহের বরফের নিচের স্তরে যদি কোনো প্রাণ থেকে থাকে, তবে তারা এই ব্যাকটেরিয়ার মতোই হবে। তাই বর্তমানে “ব্লাড ফলস” হয়ে উঠেছে অ্যাস্ট্রোবায়োলজির সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গবেষণাগার।

ব্লাড ফলস কোনো ভৌতিক গল্প নয়, এটি ১৫ লক্ষ বছরের পুরোনো পৃথিবীর সংরক্ষিত ইতিহাস। লবণ, লোহা আর অণুজীবের এই অদ্ভূত মেলবন্ধনই আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, পৃথিবী এখনও রহস্যে ঘেরা। আর এই রহস্য ভেদ করেই হয়তো একদিন মানুষ অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের দলিল খুঁজে পাবে।