সোমবার দিল্লির বুকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেষ কুমারের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর বেরিয়েই তাঁর বিরুদ্ধে চরম আক্রমণ শানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেন, “রাজনীতিতে এত বছর থাকাকালীন আমি এমন অহংকারী এবং মিথ্যাবাদী নির্বাচন কমিশনার আগে কখনও দেখিনি।”
বিশেষ ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি তৃণমূল প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে যায়। বৈঠকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর বাইরে বেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমি খুব মর্মাহত। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আমি দিল্লির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ৭ বারের সাংসদ এবং ৪ বারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে আমি অনেক কমিশন দেখেছি, কিন্তু এবারের মতো পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন জীবনে দেখিনি।”
SIR নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ: মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বাংলার প্রায় ৫৪ লক্ষ থেকে ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নিয়ম লঙ্ঘন করে ভোটারদের নিজেদের পক্ষে সওয়াল করার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। মমতার কথায়, “বিজেপির হয়ে কাজ করার জন্যই এই SIR-এর নামে নাটক চলছে। বাংলার মানুষকে নিশানা করা হচ্ছে। গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি উৎসব, কিন্তু এখানে সেই উৎসবকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে।”
কালো পোশাকে প্রতীকী প্রতিবাদ: এদিন দিল্লির নির্বাচন সদনের বাইরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কালো পোশাকে দেখা যায়। কেন্দ্রের ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণের প্রতিবাদেই এই কালো পোশাক পরেছেন বলে জানান তিনি। বঙ্গভবনের বাইরে দিল্লির পুলিশের অতিসক্রিয়তা নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বাংলায় যান, তখন আমরা রেড কার্পেট বিছাই। আর আমরা যখন দিল্লিতে আসি, আমাদের জন্য ব্ল্যাক কার্পেট অর্থাৎ হেনস্থা অপেক্ষা করে থাকে।”
মৃত ভোটারের সংখ্যা নিয়ে চাঞ্চল্য: তৃণমূল নেত্রীর দাবি, এই SIR প্রক্রিয়ার চাপে পড়ে গত কয়েকমাসে বাংলায় অন্তত ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন শুধুমাত্র বাংলাকেই এভাবে নিশানা করা হচ্ছে? উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটে কেন একই নিয়ম মানা হচ্ছে না?
তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই এই ভোটার তালিকা বিভ্রাট নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। আগামী ৪ঠা ফেব্রুয়ারি এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “গণতান্ত্রিকভাবে যদি বিজেপি লড়াই করতে ভয় পায়, তবে ইডি, সিবিআই বা নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে লাভ হবে না। আমরা এক ইঞ্চি জমি ছাড়ব না।” ৭ই ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও, তৃণমূলের পক্ষ থেকে তা স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়েছে।