উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড চা-শিল্প এখন অস্তিত্বের গভীর সঙ্কটে ভুগছে। অভিযোগ উঠেছে, চা-গাছ প্রতিস্থাপন বা ‘রিপ্লান্টিং’ (Replanting) এবং পুরনো গাছ উপড়ে ফেলা বা ‘আপরুটিং’-এর (Uprooting) জন্য বরাদ্দ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল আর্থিক অনটনের জেরে আগামী দিনে চা-বাগান শ্রমিকদের বড়সড় ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করছে শিল্পমহল।
টি-বোর্ডের দীর্ঘসূত্রিতা ও আর্থিক সঙ্কট
চা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার (Tea Board of India) লাল ফিতের ফাঁসকে দায়ী করছেন।
-
বিশাল বকেয়া: গত এক দশকে উত্তরবঙ্গের প্রায় ২৭৬টি চা-বাগান নিয়মিত পুরনো গাছ উপড়ে নতুন চারা রোপণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। টি-বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, হেক্টর প্রতি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার কথা ছিল।
-
পরিদর্শন সত্ত্বেও অর্থ মেলেনি: বাগান মালিকরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সংস্কার কাজ শুরু করলেও, কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এবং টি-বোর্ডের আধিকারিকদের পরিদর্শন সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত একটিও বাগান তাদের প্রাপ্য ভর্তুকির টাকা হাতে পায়নি।
শিল্প মহলের সূত্রে খবর, অন্তত ৮০টি বড় চা-বাগান বর্তমানে এই বকেয়া টাকার অভাবে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে পুরনো গাছের কারণে ফলন কমে আসা—এই সাঁড়াশি চাপে বাগান চালানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত
বকেয়া ৪০০ কোটি টাকা না পেলে রুগ্ণ চা-শিল্পে বড়সড় বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মালিকপক্ষ।
-
তরাই ইন্ডিয়ান প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহেন্দ্র বনশল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “যদি টি-বোর্ড প্রাপ্য সাবসিডি অবিলম্বে না-ছাড়ে, তবে আগামী দিনে চা-গাছের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। আর বাগানে গাছের সংখ্যা কমলে স্বভাবতই শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা কমবে, যার সোজা অর্থ হল শ্রমিক ছাঁটাই। এটা চা-শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।”
-
ইন্ডিয়ান টি-প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ITPA) ডুয়ার্স শাখার সচিব রাম অবতার শর্মা বলেন, “এই মুহূর্তে এই সাবসিডি-র টাকাই বাগানগুলির টিকে থাকার শেষ ভরসা।”
এর আগে আইনি পথে সুরাহা না-মেলায় হতাশ বাগান মালিকরা এখন ফের টি-বোর্ডের কাছেই মানবিক আবেদন জানাচ্ছেন। টি-বোর্ড দ্রুত পুনর্বিবেচনা না-করলে হাজার-হাজার শ্রমিকের রুজিরুটি এবং শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।