অষ্টম বেতন কমিশনের আগেই বিরাট চমক! মূল বেতনের সঙ্গে মহার্ঘ ভাতা মিশে গেলেই কি ফুলেফেঁপে উঠবে কেন্দ্রীয় কর্মীদের পকেট?

কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফের এক অভূতপূর্ব ও জোরালো বিতর্কের সূচনা হয়েছে। দেশের কোটি কোটি সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বহুল প্রতীক্ষিত ৮ম বেতন কমিশনের কার্যকারিতা এবং দাবি-দাওয়া নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে পুদুচেরিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। এর আগে চেন্নাইয়ে প্রাথমিক দফার সফল বৈঠক সম্পন্ন হওয়ার পর, আগামী ১৬ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর চণ্ডীগড়ে পরবর্তী দফার অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মী, পেনশনভোগী এবং শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনগুলি নিজেদের বহুমুখী দাবি ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কমিশনের নিরঙ্কুশ সামনে তুলে ধরবেন।

বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বছরে দু’বার নিয়মমাফিক মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (DA) বৃদ্ধি করা হয়—যার একটি অংশ জানুয়ারি এবং অন্যটি জুলাই মাস থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু বর্তমান নিয়মে ডিএ বাড়লেও তা সরাসরি বেসিক পে বা মূল বেতনের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত হয় না। বিভিন্ন কর্মচারী ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের জোরালো যুক্তি হলো, ডিএ-র একটি নির্দিষ্ট অংশ যদি সরাসরি বেসিক পের সঙ্গে মিশে যায়, তবে বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত কম মূল বেতনের কর্মীরা ভীষণভাবে উপকৃত হবেন। কারণ মৌলিক বেতন বাড়লে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বিভিন্ন ভাতা এবং ভবিষ্যতের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হিসাবও সম্পূর্ণ বদলে যাবে। অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল পেনশনার্স অ্যান্ড সুপারঅ্যানুয়েটস ফেডারেশন (AINPSEF)-এর দেওয়া সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ডিএ মার্জার এবং নতুন বেতন সংশোধনের এই যুগান্তকারী দাবিগুলি যদি সরকার মেনে নেয়, তবে আগামী বছরগুলিতে কর্মীদের সামগ্রিক বেতনের অংকে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে যাবে।

বিভিন্ন শক্তিশালী কর্মচারী সংগঠন ডিএ মার্জারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেছে। ন্যাশনাল ফেডারেশন অব পোস্টাল এমপ্লয়িজ (NFPE) এবং AINPSEF যৌথভাবে জোরালো দাবি তুলেছে যে, বর্তমান ডিএ-র অন্তত ২৫ শতাংশ অবিলম্বে বেসিক পের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হোক। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সুপারভাইজার্স অ্যাসোসিয়েশন (IRTSA) এবং পেনশনার্স অ্যান্ড সিনিয়র সিটিজেন অ্যাসোসিয়েশন (PSNM) আরও এক ধাপ এগিয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিএ মার্জারের সাহসী প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি, ন্যাশনাল কাউন্সিল-জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি (NC-JCM)-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিএ-র পরিমাণ ২৫ শতাংশের বেশি হলেই তা সরাসরি মূল বেতনের অংশ করে নেওয়া উচিত। শুধু ডিএ মার্জার নয়, বাড়ি ভাড়া বা অন্যান্য ভাতা নিয়েও বড়সড় দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। NC-JCM এবং অল ইন্ডিয়া ডিফেন্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (AIDEF) সমস্ত ধরনের ভাতা এক ধাক্কায় তিনগুণ করার এবং তা ডিএ বৃদ্ধির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সংগঠন ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বার্ষিক বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।

বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে লেভেল-১ পদের একজন কর্মীর প্রাথমিক বেসিক পে ১৮,০০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৮ম বেতন কমিশনে যদি ন্যূনতম ২.১ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ধরা হয়, তবে আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এই পদের সংশোধিত বেসিক পে লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ৩৭,৮০০ টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। AINPSEF-এর সুনির্দিষ্ট হিসাব বলছে, ১ জানুয়ারি ২০৩২ নাগাদ এই কর্মীর বেসিক পে বেড়ে প্রায় ৫৬,৭২৮ টাকা এবং ডিএ প্রায় ১৩,৬১৫ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর ঠিক এক বছর পর, অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ২০৩৩ নাগাদ ওই কর্মীর মোট গ্রস বেতন আকাশছোঁয়া হয়ে প্রায় ৭৭,৬৯৪ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জোরালো অনুমান করা হচ্ছে। তবে ডিএ মার্জার বাস্তবায়িত হলে ২০৩৩ সালে লেভেল-১ কর্মীর প্রকৃত মূল বেতন ঠিক কত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত অঙ্ক এখনই কষা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিএ মার্জার এবং বেতন সংশোধনের সমস্ত সুপারিশ মেনে নেওয়ার পরই এই হিসাব পুরোপুরি স্পষ্ট হবে।

অন্যদিকে, লেভেল-৬ পদের উচ্চপদস্থ বা অভিজ্ঞ কর্মীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রাথমিক বেসিক পে ৩৫,৪০০ টাকা। সেখানেও যদি ২.১ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কার্যকর করা হয়, তবে আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তাঁদের সংশোধিত বেসিক পে সরাসরি ৭৪,৩৪০ টাকায় উন্নীত হতে পারে। AINPSEF-এর দীর্ঘমেয়াদী অনুমান অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০৩২ নাগাদ এই শ্রেণির কর্মীদের বেসিক পে প্রায় ১,১১,৫৬৪ টাকা এবং ডিএ প্রায় ২৬,৭৭৫ টাকা হতে পারে। এমনকি ১ জানুয়ারি ২০৩৩ নাগাদ তাঁদের মোট মাসিক গ্রস বেতন প্রায় ১,৫২,৭৯৮ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের সংশোধিত ৭৪,৩৪০ টাকার প্রাথমিক বেসিক পের তুলনায় তা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। তবে এই সমস্ত হিসাব ও পরিসংখ্যান সম্পূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নিজস্ব অনুমান ও প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা এখনও কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত বা ঘোষিত হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মহার্ঘ ভাতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি মূল বেতনের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে মিশে যায়, তবে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল সেই মাসের বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বেসিক পে বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স বা অন্যান্য ভাতাও বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা কর্মজীবনে বড় আর্থিক স্বস্তি আনবে। এই কারণেই দেশের সমস্ত কেন্দ্রীয় কর্মচারী সংগঠনগুলি ৮ম বেতন কমিশনের কাছে ডিএ মার্জারের দাবিকে সবথেকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে কেন্দ্র সরকার এই সমস্ত দাবি একশো শতাংশ মেনে নেবে কি না। বর্তমানে ৮ম বেতন কমিশন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মচারী ও পেনশনভোগী সংগঠনের মূল্যবান মতামত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করছে। কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ ও রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এ বিষয়ে তাদের চূড়ান্ত সিলমোহর দেবে।