স্মার্টওয়াচ খুললেই ঘড়ির পিছন থেকে জ্বলে ওঠে সবুজ আলো! এর আসল রহস্য জানলে চমকে যাবেন

স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করেন অথচ ঘড়িটি হাত থেকে খোলার পর এর পেছনের অংশে একটি রহস্যময় সবুজ আলোর মিটিমিটি জ্বলে-নিভে যাওয়ার বিষয়টি খেয়াল করেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। অনেকেই এই বিষয়টিকে উৎপাদনকারী সংস্থার কোনো সাধারণ ডিজাইন, স্টাইলিশ লুক কিংবা চার্জিং ইন্ডিকেটর বলে ভুল করেন। কিন্তু আদতে এই ছোট্ট সবুজ আলোটি কোনো সাধারণ আলোর রোশনাই নয়; এটি আপনার দৈনন্দিন স্মার্টওয়াচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনরক্ষাকারী কার্যকরী অংশ। এর নিখুঁত কার্যকারিতার ওপরই আপনার হৃৎস্পন্দন, পালস রেট এবং রক্তে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রার হিসাব সরাসরি নির্ভর করে।
বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির পরিভাষায় এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটিকে বলা হয় পিপিজি (PPG) সেন্সর, যার পূর্ণরূপ হলো ফটোপ্লেথিসমোগ্রাফি (Photoplethysmography)। এই প্রযুক্তির মূল কার্যপদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে আলোর প্রতিফলনের নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের রক্তের স্বাভাবিক রঙ লাল হয় কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন উপস্থিত থাকে, এবং এই হিমোগ্লোবিন কণাগুলি সবুজ আলোকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে শোষণ করতে সক্ষম। যখনই আপনার স্মার্টওয়াচের পেছনের অংশে থাকা বিশেষ সবুজ এলইডি (LED) লাইটগুলি জ্বলে ওঠে, তখন সেই শক্তিশালী আলো আপনার চামড়ার উপরিভাগ ভেদ করে সরাসরি ত্বকের নিচের রক্তনালীর ওপর গিয়ে পড়ে। যখন আপনার হৃৎপিণ্ড বা হার্ট রক্ত পাম্প করে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়, তখন রক্তনালীতে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং ফলস্বরূপ সবুজ আলোর শোষণ মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে, হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত ফিরিয়ে টানে, তখন আলোর শোষণ কমে যায় এবং সেন্সরের দিকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসার পরিমাণ বেড়ে যায়। ঘড়িতে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্সর ঠিক এই আলো শোষণ এবং প্রতিফলনের সূক্ষ্ম ওঠানামা নিখুঁতভাবে মেপেই আপনার প্রতি মিনিটের হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন গুনে ফেলে।
এখন মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, বাজারে তো নানা রঙের আলো রয়েছে, তবে লাল, নীল বা অন্য কোনো রঙের আলো বাদ দিয়ে বিশেষ করে সবুজ আলোটিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে মূলত দুটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে রয়েছে। প্রথমত, সবুজ আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা ওয়েভলেন্থ এমন একটি স্তরের হয়ে থাকে যা রক্তের লাল রঙের দ্বারা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে শোষিত হতে পারে, ফলে হার্ট রেট পরিমাপের ক্ষেত্রে এটি সবথেকে বিশ্বস্ত ও নির্ভুল ফলাফল প্রদান করে। দ্বিতীয়ত, সবুজ আলো চামড়ার খুব বেশি গভীরের গভীরে প্রবেশ করে না, যার ফলে আপনি যখন হাঁটাচলা করেন, দৌড়ান বা হাত নাড়ান, তখনও সেন্সর সহজেই ডেটা ট্র্যাক করতে পারে এবং ভুল রিডিং দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এর বিপরীতে লাল বা ইনফ্রারেড আলো ত্বকের অনেক গভীরে প্রবেশ করে, যা শারীরিক গতিবিধির কারণে ভুল ডেটা দিতে পারে। সেই কারণেই ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে সবুজ আলোই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।
তবে আপনার স্মার্টওয়াচের এই সবুজ আলো সারাক্ষণ মিটিমিটি করে জ্বলে থাকা মানে এই নয় যে আপনার ঘড়িতে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা গোলযোগ দেখা দিয়েছে। ঘড়িটি যতক্ষণ আপনার কব্জিতে বাঁধা থাকে, এটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার হার্ট রেট মাপতে থাকে। বিশেষ করে আপনি যখন কোনো ধরনের শারীরিক কসরত বা ওয়ার্কআউট মোড অন করেন, তখন এই সেন্সর আরও দ্রুত গতিতে কাজ করতে শুরু করে যাতে প্রতিটি হার্টবিটের নিখুঁত হিসাব সুরক্ষিত রাখা যায়। তাই আগামী দিনে যখনই আপনি নিজের স্মার্টওয়াচে এই সবুজ আলোর খেলা দেখতে পাবেন, তখন নির্দ্বিধায় বুঝে নেবেন যে আপনার আস্থার এই গ্যাজেটটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আপনার হৃদস্পন্দনের খেয়াল রাখছে।