অভিজ্ঞতা পত্রে নম্বর না দেওয়ায় বাদ পড়েছিলেন প্রার্থী! পাটনা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে মিলল চাকরির নির্দেশ

বিহার রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিষেবা কমিশন (BSUSC) কর্তৃক পরিচালিত সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এক অদ্ভুত জটিলতার শিকার হয়েছিলেন এক প্রার্থী। বিজ্ঞাপনের সমস্ত শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও এবং প্রার্থীর কাছে বৈধ অভিজ্ঞতা পত্র থাকা সত্ত্বেও, কেবল অভিজ্ঞতা পত্রের ত্রুটি দেখিয়ে তাকে প্রথমে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়নি। পরবর্তী সময়ে আদালতের হস্তক্ষেপে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হলেও, সেই অভিজ্ঞতা পত্রের জন্য প্রার্থীকে কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। এর ফলে চূড়ান্ত মেধা তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান ওই প্রার্থী। তবে দমে না গিয়ে তিনি পাটনা হাইকোর্টে আপিল করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার পক্ষে রায় দিয়ে নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে।
পুরো বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝে নেওয়া যাক। বিহার রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিষেবা কমিশন সহকারী অধ্যাপক (দর্শন) পদে নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। এই পদের জন্য বিজ্ঞাপন নং ১৫/২০২০-২১ এর অধীনে আবেদনকারী এক প্রার্থী পাটনা হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেন। পিটিশনারের মূল অভিযোগ ছিল, দর্শন বিভাগের এই পদের জন্য তাঁকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাক্ষাৎকারের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর দাবি অনুযায়ী, তিনি ৯১ অ্যাকাডেমিক নম্বর পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, যা বিসি (BC) ক্যাটাগরির প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত ৭৬ নম্বরের কাট-অফ মার্কের তুলনায় অনেকটাই বেশি। তা সত্ত্বেও তাঁকে সাক্ষাৎকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
প্রথমে রিট পিটিশন বিচারাধীন থাকাকালীন হাইকোর্ট নির্দেশ দিলে প্রার্থী একটি সাক্ষাৎকারে উপস্থিত হন। সাক্ষাৎকারটি অনুষ্ঠিত হলেও কমিশন তাঁর অভিজ্ঞতা পত্রের ভিত্তিতে অতিরিক্ত কোনো নম্বর দেয়নি। ফলস্বরূপ, তাঁর মোট স্কোর দাঁড়ায় ৮৬.৬, যা বিসি ক্যাটাগরির প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত চূড়ান্ত কাট-অফ ৮৮-এর নিচে ছিল। এর ফলে তাঁকে আবারও নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়তে হয়।
সাক্ষাৎকারে বাদ পড়ার পর আবেদনকারী পাটনা হাইকোর্টে যুক্তি দেখান যে, তিনি একটি অঙ্গীভূত কলেজে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার জন্য নম্বর পেলেও, কমিশন তাঁকে মুঙ্গেরের হাভেলি খড়গপুর এইচএস কলেজে শিক্ষকতার জন্য কোনো নম্বর দেয়নি। এই বিষয়ে কমিশনের অদ্ভুত যুক্তি ছিল, প্রার্থীকে অঙ্গীভূত কলেজের অভিজ্ঞতার নম্বর দেওয়া হলেও এইচএস কলেজের অভিজ্ঞতার জন্য শূন্য নম্বর দেওয়া হয়েছে। কমিশনের দাবি ছিল, ওই অভিজ্ঞতা সনদটিতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্তৃক প্রতিস্বাক্ষর (Countersigned) থাকা সত্ত্বেও, তাতে কোনো নির্দিষ্ট চিঠি বা মেমো নম্বর কিংবা ইস্যু করার তারিখ উল্লেখ ছিল না।
এই মামলার শুনানিতে পাটনা হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি তলব করে। বিচারপতি রিতেশ কুমারের একক বেঞ্চের সামনে খোদ এইচএস কলেজের অধ্যক্ষ উপস্থিত হয়ে আবেদনকারীর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার সনদের সত্যতা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করেন। নিয়োগ বিজ্ঞাপনের ৭.২ ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে আদালত দেখতে পায় যে, একজন প্রার্থী শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার প্রতিটি পূর্ণ বছরের জন্য দুই নম্বর পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকারী, যদি সেই সনদটি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দ্বারা প্রতিস্বাক্ষরিত হয়ে থাকে।
আদালত আরও দেখতে পায় যে, মূল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমন কোনো কঠোর শর্ত বা নিয়ম ছিল না যে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেটে বাধ্যতামূলকভাবে মেমো বা চিঠির নম্বর এবং তারিখ থাকতেই হবে। শুনানির সময় আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, যদি কোনো প্রার্থীর সার্টিফিকেটে চিঠি বা মেমো নম্বর এবং তারিখ না থাকে, কিন্তু তাতে যদি খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের প্রতিস্বাক্ষর থাকে, তবে সেই প্রার্থীকে সরাসরি শূন্য নম্বর দেওয়ার আগে ওই সার্টিফিকেটটি যাচাই বা ভেরিফাই করার মূল দায়িত্ব ছিল কমিশনের নিজস্ব। কমিশন সেই দায়িত্ব পালন না করে ভুল করেছে।
এই সমস্ত আইনি দিক বিবেচনা করে আদালত আবেদনকারীর উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণরূপে বিবেচনায় নিয়ে তাঁর প্রাপ্ত নম্বরগুলো পুনরায় গণনা করার জন্য কমিশনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, পুনর্গণনার পর যদি আবেদনকারী ৮৮-এর নির্ধারিত কাট-অফ নম্বরের বেশি নম্বর পান, তবে আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে শূন্য থাকা পদটিতে তাঁকে অবিলম্বে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিতে হবে।