লন্ডনের ফ্রন্টলাইন ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের (Bangladesh) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT-BD)-কে “ক্যাঙ্গারু কোর্ট” এবং “রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার” হিসেবে আখ্যায়িত করলেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সিনিয়র কোর্টের সলিসিটর তথা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ সায়েদ জয়নাল আবেদিন এই প্রতিক্রিয়া দেন। এই সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তারিত আইনি বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেন।
প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা: মূল অভিযোগ
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করছে এবং বিচার ও প্রশাসনিক কাঠামোকে “রাজনৈতিক স্বার্থের যন্ত্রে” পরিণত করেছে।
‘দখলদার প্রশাসন’: রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে শেখ হাসিনার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। এমতাবস্থায়, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রশাসনিকভাবে গঠিত ইউনূস সরকারকে “দখলদার প্রশাসন (de facto regime)” হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আইনগতভাবে অকার্যকর: আন্তর্জাতিক আদালতের Namibia Advisory Opinion (ICJ, 1971)-এর উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, কোনও অবৈধ সরকারের অধীনে গৃহীত প্রশাসনিক কার্যক্রম আইনগতভাবে শূন্য ও অকার্যকর।
ICT আইনের ‘বিধিবহির্ভূত’ সংশোধন:
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) আইন সম্প্রসারণ নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতির একটি আদেশের মাধ্যমে ICT আইনকে অতীতমুখীভাবে সম্প্রসারণ করা হয়, যা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত অপরাধগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ ও ৯৩ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। এই সংশোধনকে আইনি ভাষায় “ultra vires” বা “বিধিবহির্ভূত” কর্ম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ‘দোষী প্রমাণের পূর্বধারণা’:
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের আইনজীবী বেছে নেওয়ার অধিকার হরণ, পক্ষপাতদুষ্ট প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং একপাক্ষিক শুনানির মতো উদাহরণগুলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষত ICCPR-এর ১৪(৩)(d) ধারা লঙ্ঘন করে।
নতুন নির্দেশে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন বা তদন্তাধীন ব্যক্তিরা সরকারি পদে থাকতে পারবেন না বা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। রিপোর্টে এই বিধানকে “দোষী প্রমাণের আগেই দোষ স্বীকারের পূর্বধারণা (presumption of guilt before trial)” হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে, যা আধুনিক বিচারব্যবস্থার জন্য অগ্রহণযোগ্য।
কারাগারে ধারণক্ষমতার ৩ গুণ বন্দি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আশঙ্কা:
রিপোর্টে সতর্কতার মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, ২০২৪ সালের অগাস্ট মাস থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৪ লক্ষাধিক ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা ন্যায্য বিচার ছাড়া আটক হয়েছেন।
বাংলাদেশের কারাগারগুলি বর্তমানে ধারণক্ষমতার ৩ গুণ বেশি বন্দিতে পূর্ণ রয়েছে।
বহু ক্ষেত্রে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এহেন কর্মকাণ্ড Rome Statute (1998) অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes against Humanity) হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সায়েদ জয়নাল আবেদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের “নীরবতা”-কে উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “এখন সময় এসেছে সংবিধান ও আইনের শাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর জোরদার করার।”
তবে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।