ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিমুখী চিত্র: সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা হ্রাস, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ড্রপআউট উদ্বেগ
নয়াদিল্লি, ২২শে জুলাই ২০২৫: সংসদের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার এক দ্বিমুখী চিত্র তুলে ধরেছে। এক দিকে, দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমেছে, যা প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্য দিকে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) এবং অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার প্রসারে সরকারের মনোযোগের প্রমাণ।
সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী হ্রাসের প্রবণতা:
ইউনিফাইড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন (UDISE)-এর ২০১৯-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি স্কুলগুলিতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। ২০১৯-২০ সালে যেখানে সরকারি স্কুলগুলিতে মোট ১৩.০৯ কোটি শিশু ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৭৪ কোটিতে। অর্থাৎ, চার বছরে সরকারি স্কুলে ১.৩৫ কোটি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।
শিক্ষার্থী হ্রাসের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট রাজ্যে:
- বিহার: ২.১ কোটি থেকে ১.৭৪ কোটি (প্রায় ৩৬ লক্ষ হ্রাস)
- উত্তরপ্রদেশ: ১.৯০ কোটি থেকে ১.৫৮ কোটি (প্রায় ৩২ লক্ষ হ্রাস)
- রাজস্থান: ৯৯ লক্ষ থেকে ৮৩ লক্ষ (প্রায় ১৬ লক্ষ হ্রাস)
এই তিন রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো বেসরকারি স্কুলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, জনসংখ্যার পরিবর্তন (জন্মহার হ্রাস), এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান ঝোঁক।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি:
শিক্ষার্থী হ্রাসের বিপরীতে, ২০১৪ সাল থেকে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যায় এক অভূতপূর্ব বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে:
- আইআইটি (IIT): ৭টি নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হয়ে মোট ২৩টি।
- আইআইএম (IIM): ৮টি নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হয়ে মোট ২১টি।
- এইমস (AIIMS): ১২টি নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হয়ে মোট ১৯টি।
- আইআইআইটি (IIIT): ১৬টি নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হয়ে মোট ২৫টি।
- কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়: ৮টি নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হয়ে মোট ৪৮টি।
এছাড়াও, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে যেখানে ৫১ হাজার ৬৪৯টি প্রতিষ্ঠান ছিল, ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে ৬০ হাজার ৩৮০টি প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়েছে।
উদ্বেগজনক ড্রপআউটের হার:
শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি, ড্রপআউটের হারও একটি উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। UDISE-এর ২০২৪-২৪ তথ্য অনুযায়ী:
- প্রাথমিক স্তরে (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) ড্রপআউটের হার কমেছে ১.৯ শতাংশ।
- উচ্চ প্রাথমিকে (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) এই হার ৫.২ শতাংশ।
- মাধ্যমিক স্তরে (নবম থেকে দশম শ্রেণি) এই হার ১৪.১ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
সবচেয়ে বেশি ড্রপআউট হওয়া রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে:
- বিহার: ২৫.৬ শতাংশ
- আসাম: ২৫.১ শতাংশ
- মধ্যপ্রদেশ: ১৭.৭ শতাংশ
- ঝাড়খণ্ড: ১৫.২ শতাংশ
সামগ্রিকভাবে, এই পরিসংখ্যানগুলো ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার জটিল চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই তুলে ধরে। সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস এবং ড্রপআউটের উচ্চ হার যেখানে নীতি নির্ধারকদের জন্য নতুন চিন্তাভাবনার খোরাক যোগাচ্ছে, সেখানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত সুযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।





