শিক্ষা নাকি দুর্নীতি? সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাদে তৃণমূল নেতার গোপন ‘বেডরুম’ ও টাকার ব্যাগ ঘিরে তোলপাড়

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ঘটে গেল অভাবনীয় দুই ঘটনা। একদিকে ইউনিয়ন রুমের আলমারি ভেঙে উদ্ধার হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকার ট্রলি ব্যাগ, অন্যদিকে কলেজের চারতলার ছাদে হদিশ মিলেছে তৃণমূল নেতার এক বিলাসবহুল ব্যক্তিগত ‘বেডরুম’-এর। ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।

দীর্ঘদিন কলেজ নির্বাচন না হওয়ায় হাইকোর্টের নির্দেশে সমস্ত ইউনিয়ন রুম সিল করে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন পুরসভার সাফাই কর্মীরা কলেজ চত্বর পরিষ্কার করতে যান। প্রশাসনিক নির্দেশে যখন ইউনিয়ন রুমের আলমারি খোলা হয়, তখন চক্ষু চড়কগাছ কর্তৃপক্ষের। সেখানে পার্টির ব্যানার ও হোডিংয়ের আড়ালে রাখা দুটি ট্রলি ব্যাগে মিলেছে লক্ষ লক্ষ টাকা। তবে আশ্চর্যের বিষয়, দীর্ঘদিনের পুরনো এই নোটগুলো উইপোকায় এমনভাবে খেয়ে ফেলেছে যে, ৫০০ ও ১০০ টাকার নোটগুলোর কোনোটিই আর ব্যবহারের যোগ্য নেই।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। কলেজের চারতলার ছাদের ওপর দুটি গোপন রুমের সন্ধান পান কর্তৃপক্ষ। রুমের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখা যায় এক রাজকীয় আয়োজন। মার্বেল বসানো বাথরুম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (AC) ঘর, গদি আঁটা খাট, দামি আসবাবপত্র—সব মিলিয়ে এক ঝাঁ-চকচকে বিলাসবহুল আবাসন। অভিযোগ উঠেছে, এই রুম দুটি সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পরিচালন সমিতির চেয়ারম্যান তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে তথা সমিতির সদস্য শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তৈরি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিদের এমন ব্যক্তিগত আস্তানা তৈরি এবং সেখানে টাকার ভাণ্ডার পাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ছাত্র রাজনীতির আড়ালে কলেজ ক্যাম্পাসে আসলে কী ধরনের কার্যকলাপ চলত? সরকারি অর্থ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি ব্যবহার করে এই ধরনের ব্যক্তিগত বিলাসিতা কার ইন্ধনে সম্ভব হলো, তা নিয়েই এখন দানা বাঁধছে রহস্য।

এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার সরাসরি তোপ দেগেছেন শাসকদলের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “সারা পশ্চিমবঙ্গের কলেজগুলোতে তৃণমূল জমানায় একটি সুসংগঠিত তোলাবাজির র‍্যাকেট চলছে। ছাত্রদের সহায়তার নামে এই ইউনিয়ন রুমগুলোকে ব্যবহার করা হতো টাকা সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে। সংগৃহীত টাকার সিংহভাগ বিভিন্ন স্তরের নেতাদের কাছে পৌঁছে যেত। পর্ণ কুটির থেকে শুরু করে শান্তির বাড়ি—সবাই এই লুণ্ঠনের অংশীদার।”

শাসকদলের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ ও কলেজের ভেতরে ব্যক্তিগত ‘বেডরুম’-এর অস্তিত্ব এখন রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক কালো অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও উচ্চশিক্ষা দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। ঘটনার তদন্তে নেমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এখন সময়ের অপেক্ষা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy